HomeOtol Kinareমঙ্গলের দক্ষিণ গোলার্ধ উত্তরের চেয়ে ৪০০°C বেশি গরম! লালগ্রহের ভিতরে কী আছে?

মঙ্গলের দক্ষিণ গোলার্ধ উত্তরের চেয়ে ৪০০°C বেশি গরম! লালগ্রহের ভিতরে কী আছে?

মঙ্গলের দক্ষিণ গোলার্ধ উত্তরের চেয়ে ৪০০°C বেশি গরম! লালগ্রহের ভিতরে কী আছে?

মঙ্গলকে নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহল বহু দশকের। একসময় লালগ্রহের পৃষ্ঠে তরল জলের অস্তিত্ব ছিল—এমন নানা ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ ইতিমধ্যেই গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু মঙ্গলের অতীত পরিবেশের পাশাপাশি এখন বিজ্ঞানীদের নজর আরও গভীরে, গ্রহটির অভ্যন্তরে। সাম্প্রতিক গবেষণায় এমন একটি Thermal Anomaly on Mars-এর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যা মঙ্গলের দক্ষিণ ও উত্তর গোলার্ধের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রার মধ্যে বড় পার্থক্যের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।

মঙ্গলের দক্ষিণ গোলার্ধ কি সত্যিই বেশি গরম?

গবেষণার মডেল অনুযায়ী, মঙ্গলের দক্ষিণ গোলার্ধের ভূত্বকের নিচের অঞ্চল উত্তর গোলার্ধের তুলনায় প্রায় ২০০ থেকে ৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ হতে পারে। বাইরে থেকে মঙ্গলকে একই রকম একটি শীতল পাথুরে গ্রহ মনে হলেও, তার গভীরে দুই গোলার্ধের পরিস্থিতি একেবারেই এক নয়।

কিছু অঞ্চলের গভীরে এখনও অত্যন্ত উষ্ণ বা আংশিক গলিত শিলার অস্তিত্ব থাকতে পারে বলেও গবেষণার ফল থেকে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এটি সরাসরি ভূগর্ভে গলিত শিলা শনাক্ত করার দাবি নয়; বরং মহাকর্ষীয় তথ্য ও মডেলিং থেকে পাওয়া একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।

মঙ্গলের উত্তর দক্ষিণ গোলার্ধ এত আলাদা কেন?

মঙ্গলের পৃষ্ঠের দিকে তাকালেই দুই গোলার্ধের পার্থক্য স্পষ্ট। দক্ষিণ অংশে রয়েছে বিস্তীর্ণ উঁচু ভূভাগ, প্রাচীন impact crater এবং নানা ধরনের গিরিখাত। বিপরীতে উত্তর গোলার্ধে তুলনামূলক নিচু ও মসৃণ সমভূমি বেশি দেখা যায়। এই বৈশিষ্ট্যকে বিজ্ঞানীরা Martian Crustal Dichotomy বা মঙ্গলের ভূত্বকীয় বিভাজন হিসেবে আলোচনা করেন।

এই অদ্ভুত বৈপরীত্য কীভাবে তৈরি হলো, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধারণা রয়েছে। বিশাল কোনো প্রাচীন সংঘর্ষ, মঙ্গলের অভ্যন্তরীণ তাপীয় বিবর্তন এবং ভূত্বকের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন—সবই সম্ভাব্য ব্যাখ্যার অংশ।

টাইডাল টোমোগ্রাফি কীভাবে মঙ্গলের ভিতর দেখল?

গবেষণায় মঙ্গলের অভ্যন্তর সম্পর্কে ধারণা পেতে Tidal Tomography নামের একটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। মঙ্গল সূর্যকে একটি সামান্য উপবৃত্তাকার কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে এবং তার অক্ষও হেলানো। ফলে সূর্যের মহাকর্ষীয় প্রভাবের ধরন সময়ের সঙ্গে কিছুটা পরিবর্তিত হয়।

এই পরিবর্তনের সূক্ষ্ম প্রভাব মহাকর্ষীয় পরিমাপের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে গ্রহের ভেতরের পদার্থের বণ্টন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বিভিন্ন Mars Mission থেকে সংগৃহীত তথ্যের সঙ্গে এই মডেল মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা মঙ্গলের অভ্যন্তরীণ কাঠামো সম্পর্কে নতুন সম্ভাবনা পরীক্ষা করেছেন।

দক্ষিণ মঙ্গলের তাপমাত্রা প্রাচীন Magnetic Field

এই নতুন তাপীয় ধারণা মঙ্গলের আরও একটি রহস্যের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। দক্ষিণ গোলার্ধের কিছু প্রাচীন শিলায় অস্বাভাবিক Magnetic Pattern দেখা যায়। মঙ্গলের অতীতে একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক চৌম্বকক্ষেত্র ছিল বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, যা পরে দুর্বল হয়ে যায়। দক্ষিণের অভ্যন্তরে দীর্ঘস্থায়ী উষ্ণ অঞ্চল থাকলে তা প্রাচীন শিলায় সংরক্ষিত চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।

তবে তাপমাত্রার পার্থক্যই যে এই magnetic pattern-এর একমাত্র কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো প্রমাণ এখনও নেই। এটি গবেষণার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা মাত্র।

মঙ্গলের ভূমিকম্পও কি এই রহস্যের সূত্র?

নাসার InSight Lander মঙ্গলের অভ্যন্তরীণ গঠন বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূকম্পীয় তথ্য সংগ্রহ করেছিল। সেই তথ্য বিশ্লেষণে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের মধ্য দিয়ে ভূকম্পীয় তরঙ্গের আচরণে পার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দক্ষিণ অঞ্চলে তরঙ্গ তুলনামূলক দ্রুত শক্তি হারানোর সম্ভাবনাও গবেষণার আলোচনায় এসেছে।

ভূগর্ভের তাপমাত্রা ও শিলার বৈশিষ্ট্য ভূকম্পীয় তরঙ্গের গতি এবং শক্তি ক্ষয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে Mars Seismic Activity এবং অভ্যন্তরীণ তাপীয় কাঠামোর মধ্যে সম্পর্ক ভবিষ্যৎ গবেষণায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মঙ্গল এত উষ্ণ রয়ে গেল কীভাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনও নিশ্চিত নয়। বিজ্ঞানীদের আলোচনায় কয়েকটি সম্ভাবনা রয়েছে। অতীতে কোনো বড় সংঘর্ষ মঙ্গলের অভ্যন্তরে বিপুল তাপ তৈরি করে থাকতে পারে। আবার ম্যান্টলের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী কোনো geological process তাপকে উপরের দিকে নিয়ে এসে আটকে রাখতে পারে।

আরেকটি ধারণা হলো, মঙ্গলের দক্ষিণাংশের পুরু ও প্রাচীন ভূত্বক দীর্ঘ সময় ধরে অভ্যন্তরীণ তাপ ধরে রেখেছে। পৃথিবীর মতো সক্রিয় plate tectonics না থাকায় তাপ বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াও ভিন্ন হতে পারে। তবে কোন ব্যাখ্যাটি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, তা নিশ্চিত করতে আরও পর্যবেক্ষণ ও মডেলিং দরকার।

এই আবিষ্কার কি মঙ্গলে প্রাণের প্রমাণ?

না। মঙ্গলের অভ্যন্তরে উষ্ণতার সম্ভাবনা বা প্রাচীন জলের অস্তিত্ব সরাসরি প্রাণের অস্তিত্ব প্রমাণ করে না। তবে Mars Habitability বা মঙ্গলে জীবনের উপযোগী পরিবেশের ইতিহাস বোঝার জন্য অভ্যন্তরীণ তাপ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

লালগ্রহের এই রহস্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

মঙ্গলের উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের পার্থক্য শুধু পৃষ্ঠের একটি বৈশিষ্ট্য নয়। এর পেছনে যদি অভ্যন্তরীণ তাপীয় বৈষম্য কাজ করে থাকে, তাহলে তা গ্রহটির ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস, magnetic field, seismic activity এবং অতীতের পরিবেশ সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে পারে।

Mars Interior সম্পর্কে যত বেশি তথ্য পাওয়া যাবে, তত ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হবে কীভাবে একটি পাথুরে গ্রহ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় এবং কেন পৃথিবী ও মঙ্গল একই সৌরজগতের অংশ হয়েও এত আলাদা পথে বিবর্তিত হয়েছে।

FAQ – Frequently Asked Questions

মঙ্গলের কোন অংশ বেশি গরম?

সাম্প্রতিক মডেলভিত্তিক গবেষণায় মঙ্গলের দক্ষিণ গোলার্ধের ভূত্বকের নিচের অংশ উত্তর গোলার্ধের তুলনায় প্রায় ২০০ থেকে ৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

মঙ্গলের দক্ষিণ উত্তর গোলার্ধের মধ্যে এত পার্থক্য কেন?

এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। প্রাচীন বিশাল সংঘর্ষ, অভ্যন্তরীণ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাপ আটকে থাকার মতো একাধিক সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে।

টাইডাল টোমোগ্রাফি কী?

এটি মহাকর্ষীয় প্রভাবের সূক্ষ্ম পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে কোনো গ্রহের অভ্যন্তরীণ কাঠামো সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার একটি পদ্ধতি।

মঙ্গলের ভেতরে কি এখনও গলিত শিলা আছে?

কিছু মডেল গভীরে অত্যন্ত উষ্ণ বা আংশিক গলিত শিলার সম্ভাবনা দেখাতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনো স্থানে গলিত শিলা সরাসরি শনাক্ত হয়েছে—এমন দাবি করা ঠিক হবে না।

এই গবেষণা কি মঙ্গলে প্রাণ থাকার প্রমাণ?

না। এটি মঙ্গলের অভ্যন্তরীণ তাপ ও ভূতাত্ত্বিক কাঠামো সম্পর্কে নতুন তথ্যের সম্ভাবনা দেখায়; সরাসরি জীবনের প্রমাণ দেয় না।

উপসংহার

Mars southern hemisphere hotter than northern hemisphere—এই সম্ভাবনা লালগ্রহের দীর্ঘদিনের একটি রহস্যকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ দিচ্ছে। মঙ্গলের দক্ষিণ গোলার্ধের নিচে যদি সত্যিই এত বেশি তাপ থাকে, তাহলে তার সঙ্গে ভূত্বকীয় বিভাজন, প্রাচীন magnetic field এবং ভূকম্পীয় আচরণের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে মঙ্গলের অভ্যন্তরের এই জটিল রহস্যের চূড়ান্ত উত্তর পেতে আরও তথ্য, উন্নত মডেল এবং ভবিষ্যৎ Mars Mission-এর প্রয়োজন হবে।

________

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন