শহরের গলিপথে তখন রথের আনন্দ ভাসছে। রঙিন আলো, জিলিপির গন্ধ আর খেলনার আওয়াজে মেতে উঠেছে সবাই। ঠিক তখনই ভাঙা সাইকেলে চড়ে বেরিয়েছিলেন সুধাংশু পাল, মধ্যবয়সি এক শ্রমজীবী মানুষ। বয়স হবে পঁইতাল্লিশের কাছাকাছি। ছেলেবেলায় আদর করে ডাকতেন সকলে “সুধা”। সেদিন তাঁর ছোট্ট নাতির জন্য খেলনা আর কিছু মিষ্টি কিনে আনার কথা ছিল। স্ত্রী বলেছিলেন, “খুব রাত না করে ফিরিস, শরীর ভালো না তো।” সুধা হেসে বলেছিল, “একটু ঘুরে আসি গো, ছেলে তো কতদিন পর মেলা দেখতে এল।”
কিন্তু আর ফেরা হল না তাঁর।
রাত বাড়তে থাকে। সুধা ফিরে না আসায় মা, বৃদ্ধা শান্তিময়ী দেবী চিন্তিত হয়ে পড়েন। রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ ছেলের মোবাইলে ফোন করেন। ওপাশ থেকে সুধা খুব অস্পষ্ট গলায় বলেন, “মা…আমায় ওরা খুব মারছে…”—এইটুকু বলার পরই ফোন কেটে যায়। তারপর আবার ফোন বাজে। এবার একজন অপরিচিত কণ্ঠস্বর, “আপনার ছেলে বাঁধের পাশে পড়ে আছে। দেখে যান।”
গভীর উদ্বেগ নিয়ে শান্তিময়ী দেবী পাড়া-প্রতিবেশীদের নিয়ে ছুটে যান শহরের পাশের বালিয়ারা বাঁধে। অন্ধকারে পড়ে থাকা সুধার দেহ দেখে সবার গলা শুকিয়ে যায়। মাথায় গভীর আঘাত, বুকে রক্তের দাগ। দ্রুত তাঁকে এক টোটোতে চাপিয়ে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ডাক্তার জানিয়ে দেন—সব শেষ। সুধাংশু আর নেই।
ঘটনার পর থানা গিয়ে শান্তিময়ী দেবী অভিযোগ দায়ের করেন। বলেন, “আমার ছেলে আগে কিছু ভুল করেছিল, মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল, ঠিকই। কিন্তু সে জীবন থেকে বেরিয়ে এসেছিল। এখন শুধুই কাজ করত, পরিবার চালাত। আজ যারা ওকে মেরেছে, ওদের আমি চিনি না। কিন্তু বিচার চাই।”
স্থানীয়রা জানান, ঘটনার সন্ধ্যায় কিছু দুষ্কৃতীর সঙ্গে সুধার তর্কাতর্কি হয়। তারপর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন তিনি। পুলিশের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশিস সরকার জানান, “অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
রথের রঙিন আলো তখন নিভে এসেছে শহরে। বাঁধের ধারে পড়ে থাকা রক্তের দাগ আর ভেঙে যাওয়া খেলনার বাক্স যেন বলে যাচ্ছিল—এই শহরে এক বাবা শুধু নাতির মুখে হাসি আনতে চেয়েছিল, কিন্তু তাকে ফিরতে দেওয়া হয়নি।
এই গল্প আমাদের শেখায়—অপরাধ যত ছোট হোক, তার ছায়া খুব সহজে ফুরোয় না। সমাজের ছিন্নভিন্ন প্রান্তে লুকিয়ে থাকা ন্যায়বিচারের অপেক্ষা কখনও শেষ হয় না।

