কল্পনা করুন, যদি শুধুমাত্র আপনার মনের ভাবনা দিয়েই হাত কাজ শুরু করে দেয়! কোনও সুইচ চাপতে হবে না, কোনও কমান্ড দিতে হবে না। আপনি ভাবলেন আর হাত সেটাই করল। শোনার পর মনে হচ্ছে হয়তো কোনও সাই-ফাই মুভির দৃশ্য? কিন্তু না, এটা এখন বাস্তব!
এই আশ্চর্য আবিষ্কারের পেছনে আছেন কেনিয়ার দুই তরুণ উদ্ভাবক—ডেভিড এবং মসেস। ছোট্ট এক শহরে বড় হওয়া এই দুই বন্ধু শৈশব থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু দারিদ্র্য তাদের স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সংসারের জন্য পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে দিতে হয়েছিল। তবু তাদের ইচ্ছাশক্তি হারায়নি। তারা সিদ্ধান্ত নেন এমন কিছু করবেন যা একদিন মানুষের জীবন বদলে দেবে।
তাদের যাত্রা শুরু হয় “আফ্রোজেনেসিস” নামে একটি ছোট্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে। এটা কোনও বিলিয়ন-ডলারের কোম্পানি নয়, বরং এক কোণে বসে পুরনো ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ নিয়ে শুরু করা এক ক্ষুদ্র কর্মশালা। সেখানে দিন-রাত কাটত নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করতে করতে। কোনও উন্নত ল্যাবরেটরি ছিল না, দামি যন্ত্রপাতি ছিল না, ছিল কেবল অক্লান্ত পরিশ্রম আর একে অপরের ওপর বিশ্বাস।
প্রথমদিকে তারা সাধারণ কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইস বানাতেন, যাতে স্থানীয় মানুষদের ছোটখাটো উপকার হতো। কিন্তু একদিন তাদের চোখে পড়ে বিশাল এক সমস্যা—পঙ্গু মানুষদের জন্য কার্যকর এবং সাশ্রয়ী কৃত্রিম হাতের অভাব। এখান থেকেই শুরু হয় তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—একটি এমন রোবোটিক হাত বানানো যা সরাসরি মানুষের চিন্তার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে।
সাধারণ প্রস্থেটিক হাত মাংসপেশির সংকেতের ওপর ভিত্তি করে চলে। কিন্তু ডেভিড এবং মসেস বেছে নিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ। তারা তৈরি করলেন এক বিশেষ নিউরাল বায়োপটেনশিয়াল হেডসেট, যা মাথায় পরলে মস্তিষ্কের তরঙ্গ শনাক্ত করতে পারে। কেউ যখন কোনও বস্তু ধরার কথা ভাবে, তখন মস্তিষ্ক একটি সংকেত পাঠায়। সেই সংকেত হেডসেট গ্রহণ করে, বৈদ্যুতিক তরঙ্গে রূপান্তরিত করে রোবোটিক হাতে পাঠায়। আর হাত ঠিক সেই নির্দেশ অনুযায়ী নড়ে।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বিস্ময় হল, এটি শুধু মনের ইশারাতেই কাজ করে না, বরং ভয়েস কমান্ড দিয়েও চালানো যায়। ফলে যারা মস্তিষ্কের সংকেত দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তারাও কেবল কথা বলেই হাত চালাতে পারেন।
তাদের প্রথম প্রোটোটাইপে অনেক ব্যর্থতা এসেছিল। মস্তিষ্কের সংকেত যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না, তাই তারা উন্নত সেন্সর এবং বিশেষ রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ট্রান্সমিটার যুক্ত করেন। এতে সংকেত শক্তি বাড়ে এবং হাত আরও কার্যকর হয়। এটি সাধারণ কৃত্রিম হাতের তুলনায় সস্তা, সহজে ব্যবহারযোগ্য এবং প্রশিক্ষণের ঝামেলা কম।
তবে নতুন আবিষ্কার মানেই নতুন চ্যালেঞ্জ। অর্থের অভাব, গবেষণার সুযোগের অভাব, দামি যন্ত্রপাতির অপ্রাপ্যতা—সবকিছুই তাদের পথ রুদ্ধ করেছিল। তাই তারা শহরের ই-ওয়েস্ট ডাম্পিং ইয়ার্ড থেকে পুরনো সার্কিট, ভাঙা মোটর, ব্যবহৃত ব্যাটারি সংগ্রহ করে প্রথম মডেল তৈরি করেন। প্রতিবার ব্যর্থ হওয়ার পর তাঁরা কারণ খুঁজে বের করতেন, সমাধান বের করতেন, আবার নতুনভাবে শুরু করতেন।
এছাড়াও, তাঁরা কোভিড-১৯ মহামারির সময় জীবাণুনাশক ডিভাইস এবং বায়ু বিশুদ্ধকরণ যন্ত্রও বানিয়েছিলেন। তবে তাদের সবচেয়ে বড় লড়াই ছিল অর্থের সঙ্গে। বিনিয়োগকারী না থাকায় উন্নত সংস্করণ তৈরি করা কঠিন হয়ে উঠেছিল।
বর্তমানে উন্নত প্রস্থেটিক হাতের দাম প্রায় $10,000, যা গরিব মানুষের নাগালের বাইরে। তাই তাদের লক্ষ্য কম খরচে এমন রোবোটিক হাত তৈরি করা, যা আফ্রিকাসহ বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
ভবিষ্যতে তাঁরা হাতটিকে আরও হালকা, শক্তিশালী এবং ব্লুটুথ বা ওয়াই-ফাই সমর্থিত করতে চান, যাতে সরাসরি স্মার্টফোন অ্যাপ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
ডেভিড এবং মসেসের এই যাত্রা প্রমাণ করে—সফল হতে গেলে বড় ডিগ্রি নয়, দরকার বড় স্বপ্ন আর অদম্য পরিশ্রমের। তাঁদের এই আবিষ্কার একদিন কোটি মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।

