কলেজ চত্বর জুড়ে উত্তেজনা, প্রতিবাদ, আর ছাত্রদের হাতে প্ল্যাকার্ড—”আমাদের প্রাপ্য নম্বর চাই”, “পরীক্ষা দিয়েছি, নম্বর কোথায়?”।
চতুর্থ সেমিস্টারে পড়াশোনা করছে রাজশ্রী সাহা। পড়াশোনায় কখনও খুব দুর্বল ছিল না। তবে প্রথম সেমিস্টারের একটি পেপারে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে সে। বিষয়টি প্রথমে সে নিজের দোষ বলেই ভেবেছিল। এরপর নতুন উদ্যমে আবার পরীক্ষা দিল। কিন্তু ফলাফল? আগের মতোই এক নম্বর।
রাজশ্রীর মতো একই অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছে কলেজের বহু পড়ুয়া। সকলেই বলছে—পরীক্ষা দিয়ে এলেও নম্বর বাড়ছে না। রিভিউ করেও কোনও লাভ হয়নি। সেমিস্টার পেরিয়ে যাওয়ার পরেও প্রথম সেমিস্টারের ‘ব্যাক পেপার’ যেন পিছু ছাড়ছে না। অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে।
শেষে একজোট হয়ে ছাত্রছাত্রীরা ধরনার পথ বেছে নেয়। মঙ্গলবার দুপুরে কলেজের মূল ফটকের সামনে বসে পড়ে প্রায় ৩০-৪০ জন ছাত্রছাত্রী। প্রতিবাদে গলা মিলিয়ে বলে— “এই কি আমাদের ভবিষ্যৎ? পরীক্ষা দিয়ে, খাটনি করে কী লাভ যদি নম্বরেই প্রতিফলন না ঘটে?”
তাদের দাবি, খাতা মূল্যায়নে ভুল হয়েছে অথবা খাতা দেখাই হয়নি ঠিকভাবে। বারবার এক নম্বর আসা কি বাস্তবসম্মত? কেউ বলছে, “রিভিউ করার পরেও হুবহু একই নম্বর ফিরে আসছে, এটা কি সম্ভব?”
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ জানানো হয়েছে। গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে ইমেল, চিঠি—সবই গেছে। কিন্তু কোনও সুরাহা হয়নি। কারওর খাতা ফের দেখা হয়নি, কেউ সঠিক ব্যাখ্যাও পাননি।
রাজশ্রী বলে, “একটা পেপারেই আটকে আছে আমাদের ভবিষ্যৎ। চাকরি, উচ্চশিক্ষা সব কিছুই আটকে আছে। কতবার পরীক্ষা দেব? আর কতবার একই নম্বর আসবে?”
ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগের তীব্রতা বুঝিয়ে দেয়, সমস্যাটা একক নয়, এটা গোষ্ঠিগত—একটা গোটা ব্যাচের সমস্যা। আর এই সমস্যার মূল কেন্দ্রে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতা মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার প্রতি অনাস্থা।
তবে কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ পঙ্কজ কুণ্ডু এ বিষয়ে বলেন, “এই পুরো বিষয়টাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন। খাতা দেখা, রিভিউ, নম্বর আপলোড—সবটাই বিশ্ববিদ্যালয় করে। কলেজ এখানে বেশি কিছু করতে পারে না।”
ছাত্ররা কিন্তু এত সহজে ছাড় দিতে নারাজ। তাঁরা জানিয়ে দিয়েছেন, এই প্রতিবাদ চলবে। প্রয়োজনে জেলার প্রশাসন বা রাজ্য শিক্ষাদপ্তর পর্যন্ত যাবে তারা। এমনকি বৃহত্তর আন্দোলনের কথাও ভাবা হচ্ছে।
এই ঘটনা যেন আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে কোথাও একটা ঘাটতি থেকে যাচ্ছে—সেখানে এক নম্বরও হয়ে দাঁড়ায় ভবিষ্যতের পথে দেওয়াল। এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির উপরে।
একটা ছোট নম্বরের মধ্যে লুকিয়ে আছে কত স্বপ্ন, কত জীবন, কত ভবিষ্যৎ—তা বোঝা দরকার সবার। হয়তো রাজশ্রী আর তার বন্ধুরা শুধু নিজেদের জন্য নয়, ভবিষ্যতের হাজারো পড়ুয়ার ন্যায়ের লড়াই শুরু করে দিয়েছে আজ।

