সকালে একটি দম্পতি—নীলাদ্রি ও সঙ্গীতা—চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন ঘাটের কিনারায়। তাঁদের চোখে কোনো আলাদা আলো ছিল না, ছিল না কথার চঞ্চলতা। যেন সবকিছু নিস্তব্ধ।
টিকিট কাটলেন আহিরিটোলা পর্যন্ত। কারও চোখে তারা চেনা মনে হল না। কেউ কিছু বলল না। কিন্তু তাঁদের স্তব্ধতা যেন কিছু বলছিল—একটা চাপা কান্না, একটা বর্ণনাতীত হাহাকার।
লঞ্চ ছাড়ল। মাঝগঙ্গায় পৌঁছনোর পর আচমকাই ঘটে গেল সেই অনভিপ্রেত ঘটনা—একসঙ্গে নদীতে ঝাঁপ দিলেন দু’জনে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল এক মুহূর্তের জন্য।
তারপরেই লঞ্চের কর্মীদের চোখে পড়ে যায় ঘটনাটি। কোনও সময় নষ্ট না করে ঝাঁপিয়ে পড়েন গঙ্গায়। সেফটি টায়ারের সাহায্যে একরকম জীবনকে জয় করে টেনে তোলেন দু’জনকে।
জলের ধারে বসে কাঁপছিলেন নীলাদ্রি। সঙ্গীতার চোখ তখনও বন্ধ, কিন্তু নিঃশ্বাস চলছিল। কেউ কেউ জল দিতে এগিয়ে এলেন। কেউ কেউ প্রশ্ন করতে চাইলেন—কেন? কেন এই সিদ্ধান্ত?
পুলিশ এল, অ্যাম্বুলেন্স এল। কিন্তু তার আগেই কিছু কথা ফিসফিস করে ছড়িয়ে পড়ল ভিড়ে—”ওদের নাকি একটা মেয়ে ছিল, শুনছি কিডনির অসুখে মারা গেছে… মাত্র এগারো বছর বয়স ছিল…”
নীলাদ্রির চোখ দিয়ে তখন ঝরছিল মৌনতা। তিনি শুধু বললেন, “তিনজনের সংসারে এখন একজন বেঁচে থাকলেও কী বা লাভ?”
পুলিশ কিছু বলল না, শুধু কাঁধে হাত রাখল। সঙ্গীতার শরীর তখন ধীরে ধীরে সাড়া দিচ্ছিল চিকিৎসায়। ভিড়ের মধ্যে থেকে এক বৃদ্ধা এগিয়ে এসে বললেন, “মা, সবাই হারায়। কিন্তু সব কিছু শেষ হয়ে যায় না।”
শেষ পঙক্তি:
মাঝগঙ্গা থেকে ফিরে আসা মানুষ দু’জন জানিয়ে গেলেন, মৃত্যু নয়—জীবনেরও একটি দ্বিতীয় দিক থাকে। শুধু সেটা খুঁজে নিতে হয়… কারও হাত ধরে, কারও ভালোবাসায়, অথবা নিজের হাহাকার পেরিয়ে আলোয় ফিরে এসে।
বিঃদ্রঃ – হাওড়ার ঘটনা অবলম্বনে লিখিত।
|| সমাপ্ত ||

