ফুরফুরা শরিফের আকাশে সেদিন সূর্যটা একটু যেন আলাদা রঙে আলো ছড়াচ্ছিল। চারপাশে উদ্বেগ, উত্তেজনা—কিছুটা অজানা আশঙ্কাও। মুর্শিদাবাদের দিকে তখনও সম্পূর্ণ শান্ত হয়নি পরিস্থিতি। পথে-ঘাটে আলোচনার কেন্দ্রে একটাই কথা—ওয়াকফ আইনের প্রতিবাদে ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খলা।
এই অস্থিরতার মাঝেই, হুগলির উজল পুকুর মোড়ে আয়োজন হয়েছিল প্রতিবাদ সভার। মঞ্চে একের পর এক পীরজাদা বলছেন তাঁদের কথা, তাঁদের অভিমান, তাঁদের দাবি। কিন্তু তখনই এক অনন্য ছবি আঁকা হচ্ছিল সভাস্থল থেকে মাত্র পঞ্চাশ মিটার দূরে—একটা কালী মন্দিরের সামনে।
সেখানে একা দাঁড়িয়ে এক মানুষ। মাথায় টুপি, পরনে সাদা পাঞ্জাবি। চোখে ছিল জাগ্রত সতর্কতা, মুখে দৃঢ়তা। তিনি পীরজাদা কাশেম সিদ্দিকী।
যখন অনেকেই বিভেদের আগুনে ঘি ঢালছিল, তখন কাশেম দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই আগুন নেভানোর দায় কাঁধে নিয়ে।
যেখানে দাঙ্গাবাজেরা মন্দির-মসজিদে ঢিল ছুঁড়েছিল মুখে ধর্মের নাম নিয়ে, সেখানে কাশেম দাঁড়িয়েছিলেন ধর্মের সত্যিকারের মর্মবাণী নিয়ে—ভালবাসা, সহমর্মিতা, রক্ষা।
তিনি জানতেন, কুচক্রীরা ধর্মের মুখোশ পরে ঘৃণা ছড়ায়।
কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ছিল, এক মন্দিরকে পাহারা দিয়ে যদি একজন মানুষ বোঝে যে একতা এখনও আছে—তবে সেই পাহারা সার্থক।
তিনি বলেছিলেন,
“ফুরফুরায় ইদে হিন্দু ভাইরা আমাদের বাড়িতে আসেন। দুর্গাপুজোয় আমরা তাঁদের বাড়িতে যাই। আমাদের বন্ধন তো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু হৃদয়ে গাঁথা থাকে।”
তাঁর সেই কথা যেন বাতাসে ভেসে গিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছিল বহু মন।
সন্ধ্যেবেলা সভা শেষ হল, কিন্তু কাশেম তখনও মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে। মন্দিরের পুরোহিত ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বললেন,
“আপনি একা পাহারা দিচ্ছেন দেখে আমরা আশ্বস্ত। আপনার মতো মানুষ থাকলে ধর্ম নিয়ে ভয় পাই না।”
কাশেম হেসে বললেন,
“এই তো আমাদের আসল ধর্ম—একজন আরেকজনের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা।”
সেদিন, ফুরফুরার আকাশে সূর্য ডুবেছিল ঠিকই, কিন্তু জ্বলেছিল এক অন্য দীপ—ঐক্যের দীপ।
যেটা ধর্ম দেখে না, মানুষ দেখে।
যেটা প্রতিবাদে নয়, পাশে দাঁড়ানোর স্পর্শে বিশ্বাস রাখে।
বিঃদ্রঃ – ফুরফুরা শরিফের ঘটনার আদলে লেখা এই গল্প। যা ঐক্যের বার্তা দেয়।
|| সমাপ্ত ||

