সন্ধ্যা নেমেছে রাজনপুর গ্রামে। হালকা আলো-আঁধারিতে কুয়াশার মতো ছড়িয়ে পড়েছে গুজব—“তান্ত্রিক মহাদেও এবার নাকি এক ভয়ানক কালি সাধনা করছেন নিরাশার নীচে!” কেউ বলে, “ভাগ্য ফিরিয়ে দেন!”, কেউ বলে “অসুস্থতা সারান!”। আর এই বিশ্বাসেই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ দারিদ্র্য, কষ্ট আর নিঃসঙ্গতার পথ ধরে এগিয়ে যায় অন্ধকারের দিকে।
এই গ্রামেরই এক নিরীহ মাটির ঘরের বাসিন্দা ছিল তেরো বছরের মেয়েটি—নাম রেণু। সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী, শান্ত, মেধাবী, কিন্তু বরাবরই একটু চুপচাপ। মা-বাবা খেতমজুর, সকালে মাঠে যায়, সন্ধ্যেয় ফেরে। রেণু নিজের পড়াশোনার সঙ্গে নিজের ছোট ভাইয়েরও দেখভাল করত।
একদিন রেণুর মা রুগ্ন হয়ে পড়লেন। চিকিৎসা করানোর মতো টাকা নেই, তাই স্থানীয় কেউ পরামর্শ দেয়—“মহাদেওর কাছে যাও। তান্ত্রিক, কিন্তু মিরাকেল করেন!”। রেণুর পরিবার কিছু না ভেবেই যায় মহাদেওর কাছে।
মহাদেও ওদের বলে, “মায়ের রোগ বড় খারাপ, তবে আমি তন্ত্রসাধনায় বসলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে এজন্য তোমাদের মেয়েকে সঙ্গে নিতে হবে—ওর জন্মরেখায় বিশেষ শক্তি আছে। নদীর ধারে পুজো করব রাতের বেলা।”
পরের দিন রাতে, রেণুকে একা নিয়ে যায় নিরাশা নদীর ধারে। শুরুতে পুজোর মতোই চলছিল সব। তারপর আচমকা রেণু অসুস্থ বোধ করে। তারপর আর কিছু মনে নেই…
পরদিন সকালে, রেণুকে অজ্ঞান অবস্থায় নদীর পাড়ে পড়ে থাকতে দেখে এক মৎস্যজীবী। ওকে তুলে আনা হয় বাড়িতে। শরীরে একটা সুতোও ছিল না। হুঁশ ফিরতেই আতঙ্কে কাঁপতে থাকে সে। প্রথমে কাউকে কিছু বলতে পারেনি। দিন কয়েকের মধ্যে চুপচাপ হয়ে যায়, কাঁদে, খায় না, রাতে ঘুমায় না। দুইবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল।
রেণুর মা কিছু বুঝতে না পেরে স্কুলের শিক্ষিকা মীনাদেবীর কাছে গিয়ে সব বলেন। মীনাদেবী একদিকে যেমন শিক্ষিকা, অন্যদিকে সমাজকর্মী-ও। তিনিই বুঝতে পারেন, কিছু ভয়ংকর হয়েছে। তিনি সাহস জোগান রেণুকে।
রেণু সব কিছু খুলে বলে। অভিযুক্ত তান্ত্রিকের নাম, ঘটনা সমস্ত কিছু।
মীনাদেবীর সাহায্যে গোয়ালনগর থানায় মামলা হয়। তান্ত্রিক মহাদেও তখন পলাতক। কিন্তু খোঁজ শুরু হয়। তার আগেই গ্রামের একাধিক মহিলা মুখ খোলে—তাঁদেরও “তান্ত্রিক চিকিৎসা”র নামে শারীরিক ভাবে হেনস্তা করত ওই ব্যক্তি।
এই ঘটনার পর প্রশাসন আসে, সচেতনতা শিবির হয়। স্কুলে মনোবিদ আসে রেণুর পাশে। ধীরে ধীরে সে নিজেকে গড়ে তুলতে শুরু করে।
আর তান্ত্রিক? আইন তাঁর জন্য অপেক্ষা করে।
এই গল্প শুধুই রেণুর নয়। এটা প্রতিটি সেই কণ্ঠের গল্প, যাদের চুপ করিয়ে রাখা হয়েছিল অন্ধবিশ্বাস আর ভয় দিয়ে।
কু-সংস্কার সমাজের ছায়া। আলোই একমাত্র পথ।
বিঃদ্রঃ – গল্পের চরিত্রের সাথে বাস্তবের চরিত্রের আর স্থানের কোনো মিল নাই। শুধুমাত্র কাহিনীর অবলম্বনে লেখা।
|| সমাপ্ত ||

