কালিকাপুর গ্রামের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা হাইস্কুলটা দেখতে যেমন নিরীহ, রাত নামলে তেমনই হয়ে ওঠে রহস্যে ঘেরা। দক্ষিণ দিনাজপুরের এই স্কুলে রয়েছে একটি পুরনো আদিবাসী ছাত্রী হস্টেল, যেখানে বছর কয়েক ধরেই আবাসিক পড়ুয়ারা থেকে পড়াশোনা করত। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে হস্টেলের পরিবেশে যেন অদ্ভুত কিছু পরিবর্তন ঘটছে।
রাত হলেই নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে ছমছম শব্দ—আর তারপর, ভেসে আসে এক মেয়েলি নূপুরের আওয়াজ। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে… গেটের সামনে, বারান্দার ধারে, কখনও আবার ছাদের ঠিক ওপরে। কে যেন হাঁটছে। কিন্তু! খুঁজলে কেউ নেই। হোস্টেলের বড় আপা বললেন, “হয়তো বাতাসে কিছুর শব্দ হচ্ছে, ভয় পাওয়ার কিছু নেই।” তবুও ছাত্রীরা ঘুমাতে পারছে না।
রাত বাড়লেই ওদের চোখে ঘুম নেই। কে যেন গলা নামিয়ে হাসে, কখনও দরজায় ধাক্কা দেয়, আবার কেউ কেউ বলছে, ছাদের ওপর কেউ দাঁড়িয়ে থাকতেও দেখেছে!
একদিন রাতে, দশম শ্রেণির মেয়ে মীনু আর তার ঘনিষ্ঠ দুই সাথি ঠিক করল—আজকে তারা ছাদে উঠেই দেখবে আসলে কী হচ্ছে। সাহস করে তারা চুপি চুপি বেরিয়ে এল ঘর থেকে, টর্চ হাতে ছাদে পৌঁছল। চারপাশে নিস্তব্ধতা, হঠাৎ একটা ঠং ঠং করে শব্দ—নূপুর?
তারা টর্চ জ্বালাল। তখনই টর্চের আলোতে ছাদে একটা ছায়ামূর্তি দেখা গেল। সাদা শাড়ি, পা নাড়াচ্ছে, আর হাতে ধরা একটা পুরনো পুতুল! মীনু ভয়ে চিৎকার করে দৌড়ে নিচে চলে আসে। পরদিন খবর ছড়িয়ে পড়ে, হস্টেলের অর্ধেক ছাত্রী তখনই হস্টেল ছাড়ে।
স্কুল কর্তৃপক্ষ কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না, কি হচ্ছে? ওটা কি আসলেই কোনো ভূতের কাণ্ড, নাকি শুধুই গুজব?
পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চকে খবর দেওয়া হয়। তারা আসে, হস্টেল ঘুরে দেখে, ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে। ধরা পড়ে, ছাত্রীদের মধ্যেই একদল মজা করার জন্য এই কাজ করছিল—পুরনো নাট্যশিল্পী এক সিনিয়র ছাত্রী, যার অভিনয়ে সবাই এতটাই বিশ্বাস করে ফেলে যে ঘটনাটি বাস্তব মনে হয়।
সে নূপুর পরে ছাদে হাঁটত, হালকা সাদা কাপড় পরে দাঁড়িয়ে থাকত দূর থেকে, আর নিজের তৈরি পুতুলটা হাতে রাখত যেন “ভূতের প্রতীক” হিসেবে। উদ্দেশ্য ছিল ছোট ছাত্রীদের ভয় দেখানো, আর নিজের ‘ভূতুড়ে’ খ্যাতি তৈরি করা।
বিজ্ঞান মঞ্চ সেই দিন একটি শিবির করে, ছাত্রীরা শেখে—আতঙ্ক নয়, যুক্তিই সত্য। তারা বুঝতে পারে, ভয় যতটা না বাইরের, তার চেয়েও বেশি নিজের মনের মধ্যে।
সেই রাত থেকে আর শোনা যায়নি কোনো নূপুরের আওয়াজ। কালিকাপুর হাইস্কুলের হস্টেল আবার আগের মতো প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছে। তবে মীনু এখনো মাঝেমধ্যে মজা করে বলে, “কখনও যদি সত্যিই ভূত আসে, ওকে বলে দেব বিজ্ঞানের বই পড়তে!”
বিঃদ্রঃ – কালিকাপুরের স্কুলের ঘটনাকে গল্পের আকারে লিখিত।
|| সমাপ্ত ||

