১৯৮৪ সালের ৩১শে অক্টোবর, দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ১ নম্বর সাফদারজঙ্গ রোডে তখন সাধারণ দিনের মতোই কর্মচাঞ্চল্য।
ইন্দিরা গান্ধী সেদিন সকালে একটি সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। ব্রিটিশ অভিনেত্রী ও লেখক পিটার উস্টিনভ তাঁর উপর একটি প্রামাণ্যচিত্র বানাচ্ছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারের জন্য তাঁকে যেতে হতো পাশের ভবন ১ নম্বর আকবর রোডে, যেখানে সেট তৈরির কাজ চলছিল।
ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন কঠোর, আত্মবিশ্বাসী ও রাজনৈতিকভাবে দূরদর্শী। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে অনেকটাই একাকী। দুই ছেলের মধ্যে সঞ্জয় গান্ধী ইতিমধ্যেই একটি বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। বেঁচে ছিলেন রাজীব গান্ধী, যিনি রাজনীতিতে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মা’র অনুরোধে অংশ নিয়েছিলেন।
সেদিন সকাল সাড়ে নয়টার কিছু আগে, ইন্দিরা তার সবুজ রঙের শাড়ি পরে নিরাপত্তারক্ষীদের ঘেরা গেট দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তাঁর চারপাশে নিরাপত্তা বলয় ছিল মজবুত, কিন্তু মাঝখানে ছিলেন দুই শিখ দেহরক্ষী – বেওন্ত সিং ও সত্যবন্ত সিং।
এই দুই দেহরক্ষী ছিলেন ইন্দিরার দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা দলের অংশ। কিন্তু তাঁদের মনে দাউ দাউ করে জ্বলছিল ক্ষোভ। কারণ, ইন্দিরা গান্ধীর আদেশেই কয়েক মাস আগে ‘অপারেশন ব্লু স্টার’ হয়েছিল। পাঞ্জাবের অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে ভারতীয় সেনা প্রবেশ করে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী জর্ণেল সিং ভিন্দ্রanwয়ালেকে হত্যা করেছিল। তাতে বহু সাধারণ শিখও মারা গিয়েছিলেন।
শিখ সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ এই ঘটনার জন্য ইন্দিরাকেই দায়ী করে। যদিও তিনি তা করেছিলেন ভারতের অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে।
৩১শে অক্টোবরের সেই সকালে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই বেওন্ত সিং তাঁর পিস্তল থেকে তিন রাউন্ড গুলি ছোড়েন। তারপর সত্যবন্ত সিং তাঁর স্টেনগান দিয়ে প্রায় ৩০টির বেশি গুলি চালান।
ইন্দিরা গান্ধী মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁর সাদা শরীর রক্তে রাঙা হয়ে যায়। নিরাপত্তার লোকজন ছুটে আসে। তাঁকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় AIIMS (অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস)-এ। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। চিকিৎসকেরা প্রাণপণ চেষ্টা করেন, রক্ত দেওয়া হয়, অস্ত্রোপচারের চেষ্টা হয়—তবুও তাঁকে বাঁচানো যায়নি।
দুপুর ২টো নাগাদ ভারতের একমাত্র মহিলা প্রধানমন্ত্রী, দেশের “লোহা মহিলা”, প্রাণ হারান।
এই ঘটনার পরই দেশজুড়ে শুরু হয় এক ভয়াবহ পরিণতি—শিখ বিরোধী দাঙ্গা। হাজার হাজার শিখ হত্যা করা হয় দিল্লি ও অন্যান্য শহরে।
ইন্দিরা গান্ধীর জীবন যেন শেষ হল এক রক্তাক্ত চক্রের মধ্যে, যেখানে রাজনীতি, ধর্মীয় বিদ্বেষ, এবং প্রতিশোধ—সব একসঙ্গে মিশে যায়।
শেষে থেকে যায় এক শিক্ষা—ঘৃণা কখনও ভালোবাসার জবাব হতে পারে না। আর যারা ইতিহাস গড়েন, তাঁদের মৃত্যুও ইতিহাস হয়ে ওঠে।

