আলোর উৎসবের ঠিক আগের সপ্তাহ। চারদিক আলোয় ঝলমল করছে। কিন্তু শ্যামপুরের বাইরের ছোট্ট গ্রাম পাথরডাঙায়, আলো যেন হারিয়ে গেছে বহুদিন আগেই।
ওই গ্রামে থাকতেন হরেকৃষ্ণ দাস, পেশায় কাঠমিস্ত্রি। মজুরি ভিত্তিক কাজ। একটা কাজ পেলে তিনদিন চলে, পরের পাঁচদিন অনিশ্চয়তা। স্ত্রী মমতা, তিন বছরের মেয়ে লাবণ্য আর দেড় বছরের ছেলে রোহানকে নিয়ে কোনোমতে চলছিল সংসার।
কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে কাজ নেই হরেকৃষ্ণের। ঘরের চাল ভেঙে পড়েছে, চুলোয় আগুন নেই। খাবার ফুরিয়েছে তিনদিন আগেই। গরিবের কাছে শীত মানে কষ্ট আর ক্ষুধা।
সোমবার সকালে হরেকৃষ্ণ খালি হাতে বেরিয়ে পড়ল কাজের খোঁজে। যাওয়ার সময় স্ত্রীকে বলল, “যা করেই হোক আজ কিছু টাকা জোগাড় করব… তুমি শক্ত থেকো।”
কিন্তু শক্ত থাকার সব শক্তি ফুরিয়ে গিয়েছিল মমতার। সকাল থেকে ছোট্ট রোহান খিদের জ্বালায় কাঁদছে। মমতা তাকে দুধ দিতে পারেনি। শুধু কোলের মধ্যে দুলিয়ে বলেছে, “চুপ কর বাবা, এখনই খাবার দেব…”
তবে সেই খাবার তো নেই। প্রতিবেশীরাও এখন সাহায্য করতে ক্লান্ত। ক’দিন আর কেউ দিতে পারে?
মমতার চোখে জল। মাথার মধ্যে যেন বাজ পড়ছে। তারপর আচমকাই সে উঠে দাঁড়াল। রোহানকে কাঁধে নিয়ে রওনা হল পাশের বালুঘাটে। সেখানে বয়ে চলেছে শান্ত, অথচ গভীর সোমেশ্বরী নদী।
সে রোহানকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল, “ক্ষমা করিস বাবা। আমি তোর জন্য কিছু করতে পারলাম না… তোকে কেউ দুধ দেবে না, খাবার দেবে না… চল, নদীই আমাদের আশ্রয় হোক।”
তখনই দূর থেকে চিৎকার, “মমতা! কি করছো!”
গ্রামের কিছু মহিলা নদীর ঘাটে কাপড় কাচছিলেন। তাঁরাই দৌড়ে এসে ছেলেটিকে ছিনিয়ে নিলেন মমতার হাত থেকে। কেউ কোলে নিল রোহানকে, কেউ ধরে ফেলল মমতাকে। কান্নায় ভেঙে পড়ল মমতা। “আমি খারাপ মা না… কিন্তু ওর কান্না আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না…”
ঘটনাটা ছড়িয়ে পড়ল আশেপাশে। পরের দিন ব্লক অফিস থেকে লোক এলো। পরিবারটির জন্য ত্রাণসাহায্য, শিশু খাদ্য, সরকারি প্রকল্পে নাম তোলার ব্যবস্থাও শুরু হল।
উপসংহার:
এই গল্প শুধু মমতার নয়, এটি আমাদের সমাজের এক নির্মম আয়না। যেখানে খাদ্যের অভাব আর বাঁচার লড়াই একজন মাকে এমন কঠিন সিদ্ধান্তে ঠেলে দিতে পারে। প্রশ্ন রয়ে যায়—কোথায় সেই ‘সবের অধিকার’ যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়?
আর যদি সময়মতো একটা শিশুর জন্য একফোঁটা দুধ এসে পৌঁছাত… এই গল্পটা হয়তো অন্যরকম হতে পারত।
বিঃদ্রঃ – গল্পের চরিত্রের সাথে বাস্তবের চরিত্রের আর স্থানের কোনো মিল নাই। শুধুমাত্র কাহিনীর অবলম্বনে লেখা।
|| সমাপ্ত ||

