আমরা যখনই জল সম্পর্কে ভাবি, তখনই কল্পনায় আসে নদী, সমুদ্র, হ্রদ কিংবা আমাদের প্রতিদিনের পানীয় জল। কিন্তু আপনি কি জানেন, পৃথিবীর বাইরে মহাকাশেও রয়েছে জল? শুধু জল নয়, মহাকাশে এমন ভাসমান জলের ভাণ্ডার আছে, যা আমাদের কল্পনারও বাইরে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মহাকাশে এমন এক জলমেঘ রয়েছে যেখানে পৃথিবীর সমস্ত সমুদ্রের জলের চেয়েও বহু গুণ বেশি জল মজুত আছে।
আবিষ্কার
২০১১ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এক অভাবনীয় তথ্য প্রকাশ করেন। পৃথিবী থেকে প্রায় ১২ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে, একটি কোয়েসারের (quasar) চারপাশে বিশাল জলীয় বাষ্পের মেঘ আবিষ্কৃত হয়। এই জলীয় বাষ্প মহাকাশে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে এবং এর ভর পৃথিবীর সমুদ্রের জলের ভরের প্রায় ১,৪০,০০০ ট্রিলিয়ন গুণ বেশি।
কোয়েসার হলো এক ধরনের অত্যন্ত উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক, যা গ্যালাক্সির কেন্দ্রস্থলে থাকা ব্ল্যাক হোলের শক্তি থেকে আলো ছড়ায়। কোয়েসারের চারপাশে যে গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘ জমা হয়, সেখানে তীব্র তাপ ও বিকিরণের কারণে জলীয় অণু তৈরি হতে পারে।
জল কীভাবে সেখানে পৌঁছাল?
জল বা H₂O মূলত হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের মিলনে তৈরি হয়। মহাকাশে প্রচুর হাইড্রোজেন আছে, আর অক্সিজেনও বিভিন্ন নক্ষত্রের বিস্ফোরণ (supernova) থেকে উৎপন্ন হয়। এই দুটি উপাদান নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একত্রিত হলে জল গঠিত হয়। মহাবিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ধূলিকণা ও গ্যাসের মেঘের মধ্যে এই প্রক্রিয়া ঘটে থাকে।
এমনকি আমাদের নিজস্ব মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ভেতরেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিমাণে জলীয় অণু শনাক্ত করা হয়েছে। তবে কোয়েসারের চারপাশে যে পরিমাণ জল পাওয়া গেছে, তা একেবারেই অচিন্তনীয়।
কেন এই জল এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ
মহাকাশে জল থাকার আবিষ্কার শুধু বিস্ময়করই নয়, বরং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ—
- জীবনের মূল উপাদান: পৃথিবীতে জীবন টিকে আছে জলের কারণে। সুতরাং মহাকাশে জলের উপস্থিতি মানে সেখানে জীবনের উপযোগী পরিবেশ থাকার সম্ভাবনা।
- ভবিষ্যতের মহাকাশ ভ্রমণ: মানুষ যদি একদিন মহাকাশে দীর্ঘ সময়ের জন্য বসতি স্থাপন করে, তবে জল হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ।
- মহাবিশ্বের বিবর্তন বোঝা: মহাকাশে জল কবে এবং কীভাবে তৈরি হলো, তা জানলে মহাবিশ্বের জন্ম ও বিবর্তন সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
চ্যালেঞ্জ
যদিও মহাকাশে জল ভাসমান অবস্থায় রয়েছে, তবে সেটি পৃথিবীতে আনার কোনো উপায় নেই। এর প্রধান কারণ:
- দূরত্ব: যেসব অঞ্চলে এত বিপুল পরিমাণ জল শনাক্ত হয়েছে, সেগুলো আমাদের থেকে বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে। বর্তমান প্রযুক্তিতে সেখানে পৌঁছানো একেবারেই অসম্ভব।
- অবস্থা: মহাকাশে জল মূলত গ্যাসীয় অবস্থায় বা বরফের আকারে পাওয়া যায়। ব্যবহার উপযোগী তরল জলের আকারে খুবই বিরল।
- প্রযুক্তি সীমাবদ্ধতা: এত দূরের কোনো সম্পদ আহরণ করার প্রযুক্তি মানবজাতির কাছে এখনো নেই।
আমাদের সৌরজগতেও জল
তবে আশার কথা হলো, আমাদের নিজস্ব সৌরজগতের মধ্যেই জল পাওয়া গেছে।
- চাঁদে: চাঁদের মেরু অঞ্চলে বরফ আকারে জল আছে।
- মঙ্গলগ্রহে: মঙ্গলের মাটির নিচে ও মেরু অঞ্চলে জল ও বরফ শনাক্ত হয়েছে।
- ইউরোপা ও এনসেলাডাস: বৃহস্পতি ও শনি গ্রহের উপগ্রহগুলোতে বরফের নিচে বিশাল সমুদ্রের অস্তিত্ব আছে বলে ধারণা করা হয়।
এগুলো প্রমাণ করে, জল মহাকাশে বিরল কোনো উপাদান নয়, বরং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিভিন্ন রূপে বিদ্যমান।রমহাকাশে ভাসমান জল আমাদের মহাবিশ্বের রহস্যকে আরও গভীর করে তোলে। পৃথিবীতে আমরা জলকে সাধারণ সম্পদ হিসেবে দেখি, কিন্তু মহাবিশ্বের দূর প্রান্তে এর অস্তিত্ব আমাদের নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। হয়তো একদিন মানুষ এই জলের ভাণ্ডার অনুসন্ধান করতে পারবে, অথবা এগুলো আমাদের জানাবে কোথায় কোথায় জীবন গড়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—জল শুধু পৃথিবীর নয়, পুরো মহাবিশ্বেরই একটি অপরিহার্য উপাদান।

