Homeউত্তরবঙ্গMurshidabad: ছাইয়ের ৫০০ টাকা

Murshidabad: ছাইয়ের ৫০০ টাকা

রাতটা ছিল সেই রকমই—অন্ধকার, বিভীষিকাময়, হৃদয়বিদারক।

সন্ধ্যার আলো তখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। পশ্চিম আকাশে লালচে আভা, চারপাশে হঠাৎ অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা। সামসেরগঞ্জের বেতবোনার গলি ধরে কেউ একজন হেঁটে চলেছে। সেই পা দুটো ছাই আর ভাঙা কংক্রিটের ঢিবির ওপর দিয়ে সাবধানে চলেছে। দু’হাতে একটি স্টিলের থালা, তার ভিতরে কয়েকটি আধপোড়া কাগজের টুকরো। কিন্তু ওগুলো কাগজ নয়—ওগুলো টাকা। জীবনের সঞ্চয়। পুড়ে যাওয়া সব স্বপ্ন।

থালার পাশে বসে আছেন একজন বৃদ্ধ। চোখে কেবল কষ্ট, বিষাদ আর একটা চিরন্তন প্রশ্ন—“কেন?” তাঁর নাম গণেশ ঘোষ। পেছনে ছাই হয়ে যাওয়া একটা বাড়ি, যেখানে একসময় ছিল সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন। পাশেই মুখ ঢেকে কাঁদছেন তাঁর স্ত্রী সুমিত্রা।

জীবনভর যা জোগাড় করেছেন, জমি বিক্রি করে একটু বড় করে ঘর তৈরি করছিলেন। পুরোনো বাড়ি ছোট ছিল, গবাদি পশু, সংসার, স্বপ্ন—সব যেন গুছিয়ে ফেলেছিলেন এই নতুন বাড়ির মধ্যে। আর সেখানেই রেখে দিয়েছিলেন পাঁচ লক্ষ টাকা। নতুন ভবিষ্যতের জন্য।

কিন্তু হিংসার আগুন কাউকে ছাড়ে না।
শুক্রবার রাতটা ছিল সেই রকমই—অন্ধকার, বিভীষিকাময়, হৃদয়বিদারক।

বাড়ির এক কোণে থাকা সেই পাঁচ লক্ষ টাকা, নতুন আসবাব, খাবার, গরু-বাছুর—সবকিছু পুড়িয়ে দিল অজ্ঞাত দুষ্কৃতীরা। শুধু আগুন লাগায়নি তারা, তারা জ্বালিয়ে দিয়েছিল দুইজন মানুষকে বিশ্বাস, শান্তি, আর আশা।

গণেশবাবু থালা ভর্তি পোড়া টাকার দিকে তাকিয়ে থাকেন। কোনোটার কোণে জ্বলন্ত আগুনের দাগ, কোনোটার মাঝখানে ছাই হয়ে যাওয়া সংখ্যা। “এই নোটগুলো আর কাউকে কিছু দেবে না,” বলে কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন তিনি। “তবু রেখে দিচ্ছি… নিজেরে বোঝানোর জন্য, কিছু ছিল… একদিন ছিল।”

সুমিত্রার গলা ধরে আসে, “ঘরটা শুধু ইট আর সিমেন্ট ছিল না, আমাদের চার দশকের সংসার ছিল। ওরা সেটাকে ছাই করে দিল। গরুগুলো—ওরাও তো কিছু বলেনি কাউকে! কেন ওদেরও পুড়িয়ে মারল?”

লোকজন আসছে, যাচ্ছে, ছবি তুলছে, কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছে, কেউ শূন্যতার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু এই দম্পতির চোখে এখন কেবল ছাই, ধোঁয়া, পোড়া নোটের গন্ধ আর নিস্তব্ধ কষ্ট।

তবু গণেশ ঘোষ থালাটা আঁকড়ে ধরেছেন। কারণ ওটাই তাঁর প্রমাণ—তিনি চেষ্টা করেছিলেন। তিনি একটা ঘর তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

সেই থালার ছাইয়ের নিচেই লুকিয়ে আছে একটা অসামাপ্ত গল্প—যেটা শুধু আগুন পুড়িয়ে দিতে পারেনি।

বিঃদ্রঃ – গল্পটি মুর্শিদাবাদের করুন কাহিনী অবলম্বনে লেখা।

|| সমাপ্ত ||

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন