বিদ্যুৎ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য একটি উপাদান। তবে এটি যতটা উপকারী, ততটাই বিপজ্জনকও হতে পারে যদি আমরা এর মূলনীতি ভালোভাবে না বুঝি। প্রায়ই আমরা একটি সাধারণ প্রশ্ন শুনি: “পাখিরা তো বিদ্যুতের তারে বসে থাকে, কিন্তু তাদের কেন কারেন্ট লাগে না? আর মানুষ সেই একই তারে হাত দিলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে কেন?” এই প্রশ্নের উত্তর বিদ্যুৎ প্রবাহের একটি মৌলিক নীতির সাথে জড়িত—বিভব পার্থক্য (Potential Difference)।
বিদ্যুৎ প্রবাহের মূলনীতি
বিদ্যুৎ প্রবাহ সব সময় উচ্চ বিভব (high potential) থেকে নিম্ন বিভব (low potential) এর দিকে চলে। বিভব বলতে বোঝায় একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর বৈদ্যুতিক শক্তির মান। দুটি বিন্দুর মধ্যে যদি উল্লেখযোগ্য বিভব পার্থক্য থাকে, তখনই বিদ্যুৎ সেই পথ দিয়ে প্রবাহিত হয়। যদি বিভব পার্থক্য না থাকে, তবে কোনো বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় না।
পাখির কেন কারেন্ট লাগে না?
যখন একটি পাখি বিদ্যুতের তারের উপর বসে, সাধারণত তার দুই পা একই তারের উপর থাকে। এই একই তারের দুটি বিন্দুর মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য বিভব পার্থক্য থাকে না। ফলে, পাখির শরীরের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হওয়ার প্রয়োজনীয় শর্তটি তৈরি হয় না।
বিদ্যুৎ সব সময় সবচেয়ে সহজ ও কম প্রতিরোধের পথ বেছে নেয়। পাখির শরীর দিয়ে একটি নতুন পথ তৈরি করার কোনো প্রয়োজন হয় না, কারণ বিদ্যুৎ তারের মধ্য দিয়েই সহজে প্রবাহিত হচ্ছে। তাই, পাখির শরীর ও তারের মধ্যে বিভব পার্থক্য শূন্যের কাছাকাছি হওয়ায় বিদ্যুৎ তার শরীর দিয়ে প্রবাহিত হয় না।
মানুষের কেন কারেন্ট লাগে?
মানুষের শরীর বিদ্যুতের তার স্পর্শ করার সময় সাধারণত মাটির সাথে সংযুক্ত থাকে—হয়তো সরাসরি মাটিতে দাঁড়িয়ে, বা কোনো ধাতব সিঁড়ি বা দেয়ালের সাথে লাগানো থাকে, যা মাটির বিভবের কাছাকাছি। মাটির বিভব প্রায় শূন্য (ground potential) ধরা হয়।
যখন একজন মানুষ উচ্চ বিভবের তার স্পর্শ করে এবং একই সঙ্গে মাটির সাথে সংযুক্ত থাকে, তখন একটি বড় বিভব পার্থক্য তৈরি হয়। বিদ্যুৎ এই বিভব পার্থক্যের কারণে মানুষের শরীর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মাটিতে পৌঁছায়। যেহেতু মানুষের শরীর জলীয় উপাদান ও লবণাক্ততার কারণে একটি ভালো পরিবাহী, তাই এই প্রবাহ খুব দ্রুত ঘটে এবং অনেক সময় প্রাণঘাতী হতে পারে।
উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক
ধরা যাক, একটি তারে ১১,০০০ ভোল্ট বিদ্যুৎ প্রবাহিত হচ্ছে। পাখি যদি সেই তারে বসে, তার দুই পায়ের মধ্যে বিভব পার্থক্য প্রায় শূন্য, ফলে কারেন্ট নেই। কিন্তু মানুষ সেই তার ধরলে তার শরীরের এক প্রান্তে থাকবে ১১,০০০ ভোল্ট এবং মাটির দিকে শূন্য ভোল্ট—ফলে একটি ১১,০০০ ভোল্টের বিশাল বিভব পার্থক্য তৈরি হবে, আর সেই শক্তি শরীর দিয়ে প্রবাহিত হবে।
পাখির ক্ষেত্রে কখন কারেন্ট লাগতে পারে?
যদি পাখি একসঙ্গে দুটি ভিন্ন বিভবের তার স্পর্শ করে (যেমন: ফেজ ও নিউট্রাল তার বা দুটি ফেজ তার), তখন তার শরীর দিয়ে বিভব পার্থক্যের কারণে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হবে এবং সে কারেন্টে মারা যেতে পারে। তাই পাখি নিরাপদ থাকে তখনই, যখন সে কেবল একটি তারে বসে থাকে।
মানুষ কিভাবে নিরাপদ থাকতে পারে?
মানুষের জন্য বিদ্যুৎ নিরাপদভাবে ব্যবহারের মূল শর্ত হলো গ্রাউন্ডিং (Earthing)। বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও সিস্টেমে সঠিক গ্রাউন্ডিং থাকলে বিদ্যুৎ লিক হলে তা সরাসরি মাটিতে চলে যায় এবং মানুষের শরীর দিয়ে প্রবাহিত হয় না।
এছাড়া, রাবারের জুতা, গ্লাভস ইত্যাদি পরলে শরীর ও মাটির মধ্যে প্রতিরোধ (resistance) বেড়ে যায়, ফলে কারেন্ট লাগার ঝুঁকি অনেকটাই কমে।
সহজ কথায় ব্যাখ্যা
-
পাখি একটি একক তারে বসে → বিভব পার্থক্য নেই → কারেন্ট লাগার সুযোগ নেই।
-
মানুষ তার ও মাটি দুই জায়গায় সংযোগ তৈরি করে → বিভব পার্থক্য বিশাল → কারেন্ট শরীর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
এই সহজ নীতিটিই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া বা না হওয়ার প্রধান কারণ।

