কুম্ভমেলা মানেই লাখো মানুষের ঢল, পুণ্যস্নানের আবেগ, আর কখনও কখনও… বিচ্ছেদের কান্না।
বিহারের ভাগলপুর জেলার কাহেলগাঁও গ্রামের ৮৫ বছরের বৃদ্ধ ওয়াকিল মন্ডল তাঁর চার ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রয়াগরাজের মহাকুম্ভে। জানুয়ারির সেই ভিড়ে, সেই পুণ্য লগ্নে, আচমকা আগুন লাগে সাধুদের একাধিক আখড়ায়। চারদিক ছুটোছুটি, আতঙ্ক, আর ধোঁয়ার মাঝে বিভ্রান্ত হাজারো মানুষ।
ওই হট্টগোলের মাঝেই, পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যান ওয়াকিল মন্ডল।
সেই মুহূর্তে তিনি জানতেন না, এ বিচ্ছেদ ঘণ্টা দু’য়ের নয়, হবে মাসের — চার মাসের দীর্ঘ অন্ধকার। পরিবার তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত। আশ্রম, হাসপাতাল, লাশঘর — কিছুই বাদ যায়নি। কিন্তু কোথাও সাড়া নেই। কুম্ভের ঢেউয়ে যেন হারিয়ে গেছে এক জীবন।
অন্ধকারের পরে আলোর রেখা…
চার মাস পরে, হঠাৎ শ্রীরামপুরের রাস্তার পাশে এক বৃদ্ধকে পড়ে থাকতে দেখে কয়েকজন স্থানীয় মানুষ। কথা বলার শক্তি নেই, হাঁটতেও পারেন না। তাঁর চোখে কেবল ভয় আর অসহায়তা। পুলিশ এসে তাঁকে ভর্তি করে শ্রীরামপুর ওয়ালস হাসপাতালে।
চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হন তিনি। কিন্তু তাঁর স্মৃতির দরজাগুলো তখনও বন্ধ। নাম-ঠিকানা কিছুই বলতে পারেন না। যেন হাওয়া হয়ে গিয়েছেন অতীত থেকে।
হাসপাতালের সহকারী সুপার বাসুদেব জোয়ারদার তখন যোগাযোগ করেন হ্যাম রেডিওর ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাবের সম্পাদক অম্বরীশ নাগ বিশ্বাসের সঙ্গে। শুরু হয় এক অসাধারণ মানবিক অনুসন্ধান।
বৃদ্ধের ছবি, খবর ছড়িয়ে পড়ে রেডিও ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে। আধঘণ্টা পেরোতেই মিলে যায় সূত্র। বৃদ্ধের নাম ওয়াকিল মন্ডল। বাড়ি বিহারের ভাগলপুরে। তিন বছর আগে স্ত্রী মারা গেছেন। তিনি গ্রামে ছিলেন নিঃসঙ্গ, কিন্তু পরিবার ছিল পাশে।
ফিরে আসা — একটি জীবনের জয়
সংবাদ পেয়ে বিহার থেকে চার ছেলে ট্রেনে রওনা দেন। পরদিন সকালে তারা পৌঁছয় শ্রীরামপুরে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা বাবাকে দেখে ছেলেরা আর কান্না থামাতে পারেন না। বাবা তাঁদের ঠিক চিনতে পারেননি তখনও, কিন্তু সেই ছোঁয়া, সেই চোখের চেনা উষ্ণতা যেন বলে দেয়— “আমার আপনজন ফিরে এসেছে।”
তাঁরা বাবাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেবল একটাই কথা বলেন,
— “এবার আর একা ছাড়ব না।”
শেষে একটা আলো…
ওয়াকিল মন্ডলের এই ফিরে আসা সিনেমার গল্পের মতোই। কিন্তু এ গল্প সিনেমা নয় — এ জীবনের গল্প। প্রযুক্তি, মানবিকতা আর ধৈর্য মিললে হারিয়ে যাওয়াকেও ফিরে পাওয়া যায়।

