রাত তখন গড়িয়ে সবে সাড়ে এগারোটা। জনপদের মানুষ গভীর ঘুমে ডুবে, অথচ সীমান্তের ওপারে ঝিমিয়ে পড়া অন্ধকারে তখনও টানটান উত্তেজনা। পশ্চিম ভারতের কৃষ্ণানগর সীমান্ত ফাঁড়ি, যেখানে মোতায়েন ছিল আধা সামরিক বাহিনীর ৭৭ নম্বর ব্যাটালিয়নের জওয়ানরা।
এই টহলদলটির একমাত্র নারী কনস্টেবল, নীলিমা দত্ত, ছিলেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং সাহসী। আগেই গোপন সূত্রে খবর ছিল, আজ রাতেই সীমান্ত পেরিয়ে কিছু পাচারকারী ঢোকার চেষ্টা করতে পারে। তাই নীলিমা ছিলেন দ্বিগুণ সতর্ক।
হঠাৎ খসখস শব্দ। তারপর ঝোপের আড়ালে চাপা পায়ের আওয়াজ। নীলিমা সঙ্গে সঙ্গে টর্চ জ্বালিয়ে তাক করলেন। কয়েকজন ছায়ামূর্তি দ্রুত এগোচ্ছে সীমান্তের দিকে।
তিনি হাঁক দেন,
“থামো! বিএসএফ! এক কদমও এগিও না!”
কিন্তু ওরা তো পেশাদার পাচারকারী। কোনও কথাই কানে নেয় না। নীলিমা সঙ্গে সঙ্গে নিজের পজিশন নেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই PAG রাইফেল থেকে ছুঁড়ে দেন কয়েক রাউন্ড গুলি। গুলির আওয়াজে গর্জে ওঠে রাতের নিস্তব্ধতা।
পাচারকারীরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ছুটে পালিয়ে যায় পাশের গ্রাম কামালপুরের দিকে।
এরই মাঝে নীলিমার রেডিও কলে ছুটে আসে অন্য জওয়ানরা। শুরু হয় চিরুনি তল্লাশি।
তল্লাশি শেষে পাওয়া যায় দু’টি ভারী বান্ডিল। খুলতেই চোখ কপালে ওঠে সকলের।
মেথাকোয়ালোন – ১ কেজি ৩০ গ্রাম
কোডিন – ৭ কেজি ১২০ গ্রাম
ব্রুসিন অ্যানহাইড্রাস – ১০টি বাক্স
সমস্ত মিলিয়ে বাজাজ মূল্য প্রায় ৩ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা!
অন্যদিকে, একই রাতে আরও একটি অভিযান চালায় ৮৫ নম্বর ব্যাটালিয়নের একটি দল, যারা পাহারা দিচ্ছিল পূর্ব সীমান্তে, নলিনীপুর চৌকিতে। ওখানে ধরা পড়ে এক ব্যক্তি, যার কোমরের বেল্টেই লুকানো ছিল ৩টি সোনার বিস্কুট। ওজন ৪৬৬.২৯ গ্রাম। আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ৪৭ লক্ষ টাকা।
সকাল হতেই পুরো ঘটনায় তোলপাড় সীমান্ত অঞ্চল।
জওয়ানদের সাফল্য নিয়ে গর্বিত ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার জানান—
“আমাদের প্রতিটি জওয়ান, বিশেষ করে নারী কর্মীরা যে সাহসিকতা ও পেশাদারিত্ব দেখিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এটাই আমাদের সুরক্ষা দেওয়ার শপথের প্রতিফলন।”
আর নীলিমা?
তিনি চুপচাপ, চোখে প্রশান্তি। সহকর্মীরা তাকে ঘিরে উচ্ছ্বাস করলেও তিনি শুধু বললেন—
“এই মাটির সুরক্ষা আমার দায়িত্ব। আমি শুধু তা-ই করেছি।”
আর সীমান্ত?
সেই তো রোজের মতো আবার আঁধারে ঢাকা, কিন্তু এক রাতের গল্পে জ্বলে আছে এক সাহসিনীর নাম।

