চরঘাটা নামের ছোট্ট একটা গ্রাম। বাঁকুড়া জেলার শেষপ্রান্তে। যেভাবে আঁকাবাঁকা কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে সেখানে পৌঁছতে হয়, তাতে মনে হয় যেন শহরের ছোঁয়া থেকে যোজন যোজন দূরে। বর্ষা এলেই এই গ্রামে সময় যেন থমকে যায়—কারণ কাদার রাস্তা, জলমগ্ন গর্ত আর জীবনের সঙ্গে লড়াইয়ে হেরে যাওয়া মানুষজন।
সেই গ্রামেই থাকেন বিরেন মল্লিক—সত্তর ছুঁইছুঁই বৃদ্ধ। সকালে হাঁস-মুরগি নিয়ে উঠোনে বসে ছিলেন। আচমকাই বুকে ব্যথা শুরু হয়। ছেলের বউ চিৎকার করে ডাকেন পাশের প্রতিবেশীদের। ছোট ছেলে অভীক দৌড়ে আসে, মুঠোফোনে কল করে অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু ফোনের ওপার থেকে উত্তর আসে,
“আপনাদের গ্রামে তো রাস্তা নেই স্যার, বৃষ্টি হলে ঢোকা যায় না।”
চারপাশে তখন হাঁটু জল আর থকথকে কাদা। শেষমেশ প্রতিবেশী চুনীলাল, পরেশ আর সুভাষ মিলে বিরেনবাবুর পুরনো দড়ির খাটিয়াটা এনে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে বানায় একখানা ডুলি। প্লাস্টিক দিয়ে গায়ে ঢেকে কাদামাখা পথ ধরে তারা হাঁটতে থাকে। কারও পায়ে স্যান্ডেল নেই, কেউ খালি গা, কেউ পিছলে পড়ে আবার উঠে দাঁড়ায়।
পথটা মাত্র তিন কিলোমিটার, কিন্তু সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। কেউ বলে,
“দেখিস না, এই ভাঙা রাস্তাই একদিন কারও শববাহী রাস্তা হয়ে দাঁড়াবে!”
বিরেনবাবুর ছেলের চোখে তখন জল, কিন্তু সে চুপ করে থাকে। বড় রাস্তার কাছে পৌঁছে অবশেষে একটা অটোভ্যান পাওয়া যায়, তাতে করেই তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে।
সেই দিন সন্ধেয় গ্রামের বাচ্চারা জানলায় দাঁড়িয়ে দেখে—ফেসবুকে ছবি এসেছে,
“খাটিয়ায় রোগী নিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাসী, অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে পারে না।”
সবার মুখে একটাই কথা—“লজ্জা!”
চরঘাটা গ্রামের সুধা মাস্টারমশাই বলেন,
“এই রাস্তায় কেবল মানুষ নয়, মর্যাদাও কাদায় ডুবে আছে। কে জানে কবে রাস্তা হবে, তার আগেই হয়তো কেউ আর রাস্তায় চলার অবস্থায় থাকবে না।”
রাত গভীর হয়, বৃষ্টি পড়ে টিপটিপ করে, আর চরঘাটা ঘুমোয় না। কারণ গ্রামটা জানে—পরের দিন যদি আরও কেউ অসুস্থ হয়, আবারও একই কাহিনি শুরু হবে।
আরও এক খাটিয়া বাঁধা হবে… আরেকবার কাদায় বাঁধা পড়বে মানুষের আশা।

