সন্ধ্যাবেলা। সূর্যটা তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা রোড দিয়ে দ্রুত ছুটে চলেছে দু’টি বাইক। একদিকে যাচ্ছেন তিন বন্ধু, অন্যদিকে ফিরছেন আরও দুই জন। পাঁচজনেরই মুখে হালকা হাসি, কেউ ফোনে কথা বলছে, কেউ কানে হেডফোন লাগিয়ে রেখেছে। কিন্তু একটাও মাথায় হেলমেট নেই।
বাঁকুড়ার কোতুলপুর থেকে আসা তিনজন হয়তো ভাবেননি, আজকের এই যাত্রা হবে তাঁদের জীবনের শেষ সফর। অন্য দুই বাইক আরোহীও জানতেন না, কয়েক সেকেন্ডের অসতর্কতায় কী ভয়ঙ্কর পরিণতি অপেক্ষা করছে তাঁদের জন্য।
ঘটনাস্থল: চন্দ্রকোনা থানার ক্ষীরপাই ফাঁড়ির বুড়ির পুকুর মোড়। রাস্তার সেই বাঁকে কোনও সিগন্যাল ছিল না, ছিল না কোন গতিনিয়ন্ত্রণ। হঠাৎই মুখোমুখি চলে এল দুটি বাইক। আর তারপর—একটা বিকট শব্দ।
দুটি বাইক একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যেই ছিটকে পড়ল পাঁচজনই। জনা কয়েক পথচারী ছুটে এলেন, রাস্তার পাশে পড়ে রইল রক্তাক্ত শরীর। কারও চোখ খোলা, কারও ঠোঁটে জমে থাকা অর্ধেক কথার ছাপ।
স্থানীয়রা ও পুলিশ দ্রুত আহতদের উদ্ধার করে প্রথমে নিয়ে গেল ক্ষীরপাই হাসপাতালে। পরে অবস্থার অবনতি হলে পাঠানো হয় ঘাটাল মহকুমা হাসপাতালে। সেখানে ডাক্তাররা জানালেন—তিনজন আর নেই।
বাকি দু’জনের অবস্থাও সংকটজনক। চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কিন্তু মাথায় চোট গুরুতর।
পুলিশ জানায়, পাঁচজনের কারও মাথায় হেলমেট ছিল না।
এ খবর ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঘাটালজুড়ে। স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা চুপচাপ নিজের হেলমেটটা ভালো করে পরে নেয়। পাশেই তার বন্ধু ফিসফিস করে বলে, “ওদের যদি হেলমেট থাকত… হয়তো এমনটা হতো না…”
এই গল্পটা হঠাৎ থেমে যাওয়া পাঁচটি প্রাণের নয় শুধু, এই গল্পটা একটা শিক্ষা—বাঁচার শিক্ষা।
একটা হেলমেট হয়তো মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না সবসময়, কিন্তু তা হতে পারে একটা দ্বিতীয় সুযোগের আশা।
রাস্তা শুধু গতির জন্য নয়, দায়িত্বেরও। সেই দায়িত্ব পালন করলেই বাড়ি ফিরে গিয়ে মা’র মুখটা দেখা যায়। নইলে, একটুখানি অসতর্কতায় গল্পটা শেষ হয়ে যায় চিরতরে।

