প্রীতি ছোট থেকেই একটু আলাদা ছিল। মৃদু স্বভাব, শান্ত চোখ, স্বপ্ন দেখত—একটা সুন্দর সংসার হবে, যেখানে ভালোবাসা থাকবে, থাকবে হাসি, আর থাকবে একরাশ নির্ভরতা।
সেই স্বপ্নের শুরুটা হয়েছিল সাত বছর আগে, সামাজিক মাধ্যমে এক তরুণের সঙ্গে আলাপ থেকে। নাম ঋত্বিক। প্রীতির মনের ভাষা বুঝত, ওর কবিতা পড়ত, ফোনে গল্প করত ঘন্টার পর ঘন্টা। প্রীতি ভাবত, “এই তো আমার জীবনসঙ্গী!” পরিবার একটু বিরোধিতা করলেও শেষমেশ ভালোবাসার জয় হয়েছিল। ছয় মাস আগে বিয়েটা হয়।
বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই যেন আকাশ কালো হতে শুরু করে। ঋত্বিক বদলে যায়নি, কিন্তু তার পরিবার প্রীতিকে যেন মেনে নিতে পারেনি। কথা কাটাকাটি, অপমান, একঘরে করে রাখা, মাঝে মাঝে ঠেলে দেওয়া—সবই চলত ঘরের অন্দরে। প্রীতি প্রথমে কাউকে কিছু বলেনি। কারণ সে ভেবেছিল, নতুন মানুষ, নতুন জায়গা, সময় লাগবে। কিন্তু দিন গড়ালে বোঝে, এই সময়টা শুধু তাকে ধ্বংস করছে।
একদিন সহ্য করতে না পেরে সে মামাকে জানায়। প্রীতির মামা, যিনি তাঁকে ছোট থেকে মানুষ করেছেন, স্তব্ধ হয়ে যান। বোঝানোর চেষ্টা করেন, বলেন, “সব মিটে যাবে, আমরা আছি তোর পাশে।” কিন্তু সব ‘থাকার’ পরেও, প্রীতি একা হয়ে গিয়েছিল ভিতরে ভিতরে।
জামাইষষ্ঠীর প্রস্তুতি
সেদিন ছিল জামাইষষ্ঠী। বাড়িতে ফোন করে বলেছিল,
“মা, আমি আসব… এই প্রথম জামাইষষ্ঠী, নতুন শাড়িটা বের করো।”
মা হেসে বলেছিলেন,
“তোর পছন্দের খিচুড়ি-ইলিশ করব। জামাইকেও বলিস খালি খালি চলে না…”
সবকিছু ঠিকই চলছিল। হাসির গল্পে মোড়া ছিল সেই সকালটা। কিন্তু বিকেলের দিকে একটা ফোন যেন সবকিছু উল্টে দিল।
“আপনার মেয়ে বহুতল থেকে ঝাঁপ দিয়েছেন…”
শেষ ঝাঁপ
বহুতলের নিচে নিথর হয়ে পড়ে ছিল প্রীতির শরীর। আর কিছু বলার ছিল না। মুখে লেগে থাকা এক টুকরো বিষণ্ণতা বলে দিচ্ছিল, সে বুঝে গিয়েছিল—এই সংসারটা তার স্বপ্নের মতো নয়।
ময়নাতদন্ত চলছে, মামলা চলছে, প্রতিবেশীরা বলাবলি করছে। কিন্তু প্রীতির বাবা, মা, মামা—তাঁদের প্রশ্ন একটাই,
“এত কষ্ট নিয়ে মেয়ে কীভাবে হাসিমুখে জামাইষষ্ঠীর কথা বলল?”
একটি শেষ প্রশ্ন
এটা কি আত্মহত্যা, নাকি আরও একটি ধীরে ধীরে খুন হয়ে যাওয়ার গল্প?
এটা কি ভালোবাসার ভুল মূল্যায়ন, না কি সমাজের কাছে মেয়ের নিরাপত্তাহীনতা?
শেষ কথা
প্রীতির মতো হাজারো মেয়ে প্রতিদিন হাসতে হাসতে ভেঙে পড়ছে। পরিবার, সমাজ, আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিটি অশান্তির রাত ধীরে ধীরে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর মুখে।
এই গল্প যেন আর না হয়।
এই মৃত্যুগুলো যেন আর না ঘটে।
ভালোবাসা মানেই আত্মসমর্পণ নয়—সন্মানের সঙ্গে বাঁচাও এক অধিকার।
একটি প্রীতি হারিয়ে গেলেও, আরও অনেক প্রীতিকে যদি বাঁচানো যায়—তবেই তাঁর মৃত্যু অর্থহীন হবে না।

