Homeদক্ষিণবঙ্গBarasat: অকালের বজ্র ঘণ্টা

Barasat: অকালের বজ্র ঘণ্টা

“হিরণ—যে হাসি দিয়েছিল, বজ্রও নিতে পারল না।”

বেলা তখন পৌনে একটা। নীলগঞ্জ শিক্ষায়তনের বারান্দায় তখন কোলাহল। ক্লাস সেভেন থেকে টেন—সবাই দল বেঁধে মাঠে নেমেছে। কেউ ক্রিকেট খেলছে, কেউ পেছনের নারকেলগাছের ছায়ায় বসে আড্ডা দিচ্ছে। কিছু ছেলেমেয়ে ক্যান্টিনের পাটিশপ্তা নিয়ে ব্যস্ত।

হিরণ মাইতি, নবম শ্রেণির ছাত্র, একটু চুপচাপ গোছের হলেও টিফিনের সময় তার হাসিটা সব বন্ধুর মুখে আলো এনে দিত। সে দিনটাও আলাদা ছিল না। সে আর তার তিন বন্ধু—তন্ময়, অর্ণব আর দীপ্ত—স্কুলের মাঠের মাঝখানে বসে গল্প করছিল। হিরণ তার টিফিন ক্যারিয়ার থেকে বের করল মায়ের দেওয়া পরোটা-আলুর দম। একটা টুকরো ছিঁড়ে তন্ময়ের দিকে এগিয়ে বলল, “খাস না একটু? মা আজ একটু বেশি ঝাল দিয়েছে।”

হঠাৎ আকাশ কালো হতে শুরু করল। যেন মেঘেরা দল বেঁধে এসেছিল স্কুলের ওপর ছায়া ফেলতে। দূরে কোথাও বজ্রের গর্জন শোনা গেল, কিন্তু ছেলেরা তাতে বিশেষ পাত্তা দিল না।

“আরে দে না বলছি, কতদিন পর তো এমন পরোটা পেলি,” বলে হিরণ আবার জোর করে তুলে দিল এক টুকরো তন্ময়ের মুখে।

ঠিক তখনই—
শাঁই…ড্যাঁং…

এক বিকট শব্দে যেন আকাশ ফেটে পড়ল। মাঠের মধ্যেই বিদ্যুতের এক ঝলক তীরের মতো নেমে এল। সবাই চোখ বন্ধ করে ফেলল। আর যেই চোখ খুলল… দেখল হিরণ পড়ে আছে মাঠে।

তার চোখ বন্ধ। মুখে কোনও শব্দ নেই। আশেপাশের মাটি পোড়া গন্ধে ভরে উঠেছে।

“হিরণ! হিরণ! উঠ! প্লিজ ওঠ,” চিৎকার করে উঠল অর্ণব। দীপ্ত দৌড়ে গেল স্কুল ভবনের দিকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মাঠে ছুটে এল শিক্ষক-শিক্ষিকারা।

তড়িঘড়ি হিরণকে তুলে গাড়িতে তোলা হল। গন্তব্য—বারাসত সরকারি মেডিক্যাল কলেজ।

বন্ধুরা ভেতরে ভেতরে জানত, তারা হিরণকে হারিয়ে ফেলেছে। তবু বিশ্বাস করতে চায়নি।

ঘণ্টাখানেক পর খবর এল—
হিরণ নেই।

স্কুলের মাঠটা নিঃশব্দ। যেখানটায় সে বসে ছিল, সেখানে ছোট্ট একটা ছেঁড়া টিফিন ক্যারিয়ার, আর তার পাশে পড়ে থাকা একটা পোড়া আলুর টুকরো।

আকাশও কাঁদে

হিরণের বাবা দিনমজুর। মা স্থানীয় কারখানায় কাজ করেন। একমাত্র ছেলের মুখখানি নিয়ে তাদের দিন শুরু হত। মা যখন বারান্দায় বসে হিরণের স্কুল ইউনিফর্ম ইস্ত্রি করতেন, হিরণ তখন বইয়ের ব্যাগ গুছিয়ে বলত, “আজকে তো লাস্ট পিরিয়ডে ম্যাডাম কবিতা পড়াবেন, শুনেছো মা? ‘আষাঢ়ে সন্ধ্যা’—এই নামটা কী সুন্দর না!”

কেউ কল্পনাও করেনি, সেই ‘আষাঢ়ে সন্ধ্যা’-র মতই হিরণের জীবন মেঘে ঢাকা সন্ধ্যায় শেষ হবে।

বন্ধুরা স্কুলের মাঠে এক কোণায় একটা ছোট্ট স্মৃতিস্তম্ভ বানিয়েছে। সেখানে লেখা—

“হিরণ—যে হাসি দিয়েছিল, বজ্রও নিতে পারল না।”

শেষ পংক্তি:

এই গল্প শুধু একটি দুর্ঘটনার নয়, বরং সেই হাজারো ছাত্রের গল্প—যারা আকাশের অনির্দেশ্য রোষে হারিয়ে যায়। আমাদের স্কুল, সমাজ আর রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন রেখে যায়—“বজ্রপাত কি শুধুই প্রকৃতি, নাকি আমরা প্রস্তুত না থাকার অজুহাত?”

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন