বৃষ্টির দিনে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অরুণ, সমীর, জাফর, সাদিক আর আরও সাতজন শ্রমিক ফিরে যাচ্ছিলেন নিজের গ্রামে। অনেক দূরের জেলা থেকে তাঁরা এসেছিলেন নদীবাঁধে বস্তা ফেলার কাজে। কাজ শেষ, কিন্তু রাত তখন গাঢ়। সরকারি নিয়মে নদী পারাপার তখন বন্ধ।
শহর থেকে অনেক দূরে, গঙ্গার মতোই বিশাল এক নদীর ধারে অবস্থিত পূর্বজোড়া ঘাট। ফেরিঘাটে পৌঁছেও তাঁদের অপেক্ষা করতে বলা হয় সকাল পর্যন্ত। কিন্তু দীর্ঘদিন ঘরছাড়া, মায়ের মুখ দেখতে ব্যাকুল অরুণরা চুপচাপ বসে থাকতে পারলেন না। কেউ একজন বলল, “ঘাটের ওপারে একটা মাছ ধরার নৌকা আছে, একটু ম্যানেজ করলেই হয়ে যাবে।”
খোঁজ নিয়ে পাওয়া গেল দুজন মাঝিকে—বিরাজ ও কুট্টি। ওরা বলল, “৮০০ টাকা দাও, পার করে দেব।” অন্ধকার রাত, ঢেউ তখনো শান্ত হয়নি। তবুও নৌকায় উঠে পড়ল সবাই। ১১ জন শ্রমিক ও দুই মাঝি নিয়ে ছোট্ট একটি নৌকা রওনা দিল পশ্চিমদুয়ার ঘাট-এর দিকে।
কিন্তু মাঝনদীতে গিয়েই ঝড়ো হাওয়া ও প্রবল স্রোতে দুলে উঠল নৌকা। ভারসাম্য হারিয়ে নিমেষে উলটে গেল সেটি। চিৎকার, হাহাকার—জলের নিচে হারিয়ে গেল অনেক স্বপ্ন, অনেক অপেক্ষা।
স্থানীয়রা ছুটে এলেন। পুলিশ, বিপর্যয় মোকাবিলা দল আর গ্রামবাসীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে বারো জনকে উদ্ধার করল। কিন্তু খোঁজ মেলেনি একজনের—রফিকুল শেখ। মাত্র বত্রিশ বছর বয়স। তার ব্যাগটি পাওয়া গেল উদ্ধার হওয়া নৌকাটির ভেতরেই।
রফিকুলের পরিবার কান্নায় ভেঙে পড়ে। স্ত্রী কুলসুম বললেন, “ওর ছেলে বাবার জন্য দরজা খুলে বসে আছে।” তার ছোট ভাই জাহাঙ্গীর বলল, “আমরা ওর খবর পাচ্ছি না। দাদা নদী পার হচ্ছিল, এখন কোথায় জানি না!”
পরে জানা গেল, মাঝরাতে নৌকা চালানো ছিল বেআইনি। যার নৌকা, সে জানত না ওটা ব্যবহার করা হয়েছে। সে বলল, “রাতে কেউ আমার নৌকা খুলে নিয়ে গেছে। আজ সকালেই ওটা খুঁজে পেয়েছি অন্য ঘাটে।”
স্থানীয় প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। দুই মাঝিকে আটক করা হয়েছে। তদন্ত চলছে। কিন্তু রফিকুলের পরিবারের কান্নার কোনও তদন্ত নেই।
এই গল্প শুধু নদী ডুবে যাওয়ার নয়, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, অবহেলা আর অসচেতনতার কারণে একটি পরিবারের জীবন ডুবে যাওয়ার গল্প।
সতর্ক হোন। জীবন বড় দামি—ভাড়ায় চালিত ঝুঁকি নয়।
বিঃদ্রঃ – গল্পের চরিত্রের সাথে বাস্তবের চরিত্রের আর স্থানের কোনো মিল নাই। শুধুমাত্র কাহিনীর অবলম্বনে লেখা।
|| সমাপ্ত ||

