বর্ষাকালে গঙ্গার জলে যেমন স্রোতের গর্জন, তেমনই যেন সাঁতার কেটে চলেছে এক অপার্থিব ছায়া। হুগলির কোন্নগর থেকে উত্তরপাড়া পর্যন্ত সেই ছায়া বিস্তার করে চলেছে আতঙ্কের ডানা। জনশ্রুতি নয়, চাক্ষুষ সত্য; সে ছায়া আর কিছু নয়— এক আস্ত জলচর, এক বিপজ্জনক অতিথি — কুমির!
পুণ্যতোয়া গঙ্গার জলে স্নান করিয়া বহু লোক আত্মশুদ্ধির বাসনায় নেমে থাকেন। কেউ কেউ কাঁধে জল নিয়ে রওনা হন তারকেশ্বর মহাদেবের শরণে। এমত অবস্থায় গঙ্গায় এক গম্ভীর গমনকারী কুমিরের আবির্ভাব একপ্রকার শঙ্খধ্বনি ছাড়া যুদ্ধের সংকেত বৈ আর কিছু নয়।
স্থানীয় বাসিন্দা শুভাশিস ভট্টাচার্য, যিনি প্রতিদিন ফেরিঘাটে যাত্রী পারাপারে নিয়োজিত, একদিন হঠাৎই লক্ষ্য করেন জলভেদী এক বৃহৎ প্রাণীর গমন। বিস্ময় ও আতঙ্কে স্তম্ভিত তিনি তৎক্ষণাৎ মুঠোফোনে ধারণ করেন সেই দৃশ্য। কুমিরের দৈর্ঘ্য নাকি প্রায় সাত ফুট! লঞ্চে থাকা অন্যান্য যাত্রীরাও ওই দৃশ্য দেখে চমকিত হন।
বাঁশবেড়িয়ায় পূর্বেই কুমিরের দেখা মেলায় প্রশাসন সচেতনতা প্রচার আরম্ভ করেছিল। এখন কোন্নগর, উত্তরপাড়া, রিষড়া পর্যন্ত গঙ্গার পাড়ে তীব্র সতর্কতা দেখা দিচ্ছে। কুমিরের চলাফেরার এই বিস্তার যেন নদীভিত্তিক দৈত্যের আবির্ভাব।
এদিকে শ্রাবণ মাসে শুরু হইয়া গিয়াছে শ্রাবণী মেলা। শেওড়াফুলি ঘাট হইতে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী জল সংগ্রহ করিয়া পায়ে হেঁটে রওনা হন তারকেশ্বরের উদ্দেশ্যে। বনদপ্তরের আধিকারিক বলেন, “গঙ্গার এই জলাচর আপাতত স্থলভাগে উঠে আসিবার সম্ভাবনা ক্ষীণ, তথাপি সতর্কতা বাঞ্ছনীয়। আমরা জেলা প্রশাসনকে মাইক প্রচার করিবার অনুরোধ করিয়াছি। সাধু ও পুণ্যার্থীবৃন্দ যেন স্নানের সময় অতিশয় সচেতন থাকেন।”
গঙ্গা, যিনি যুগযুগান্তর ধরে পাপ মোচনের প্রতীক, এখন তিনিই যেন আপন বক্ষে এক ভয়াল রূপ ধারণ করিয়াছেন। মানুষ জপে তপে নিজেকে সাফ করিবার জন্য নামেন যেখানে, সেখানেই এক অদৃশ্য আঁচড়!
সতর্ক হই, সংযত হই, প্রার্থনায় থাকি — কারণ গঙ্গা আজ শান্ত নহে, তিনি আজ গম্ভীর।

