কলকাতার উপকণ্ঠে অবস্থিত ছিল এক শান্ত শহর—বসন্তপুর। সেখানেই বাস করত সাম্যবর্ণা, বয়স মাত্র তেইশ। শহরের অর্ধেক মানুষ তাকে চিনত তার গলার জাদুতে—রবীন্দ্রসঙ্গীত, ভজন কিংবা লোকগান—সবকিছুতেই ছিল সমান দক্ষতা।
গানের পাশাপাশি সম্প্রতি সাম্যবর্ণা আকৃষ্ট হয়েছিল যোগাভ্যাসে। মানসিক শান্তি খুঁজতে চাইছিল সে। বহুদিন ধরে বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ছিল মুম্বইয়ের সত্যযোগ আশ্রম – এর সঙ্গে। অবশেষে একদিন, একা একাই সে রওনা দেয় সেখানে। আশ্রমটির অবস্থান ছিল মুম্বই শহরের বাইরে, এক নির্জন বাঁধের ধারে।
তবে কারও কল্পনাতেও ছিল না, এই সফরই তার জীবনের শেষ হবে।
সাম্যবর্ণা আশ্রমে পৌঁছানোর তিন দিনের মাথায় এক সকালে খবর আসে—
“সাম্যবর্ণার নিথর দেহ পাওয়া গেছে বাঁধের জলে ভাসতে। হয়তো স্নান করতে গিয়ে পা হড়কে পড়ে গেছে।”
এ কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে যান ওর বাবা দিলীপ চক্রবর্তী। কিছু না ভেবেই মঙ্গলবার ভোরে মুম্বইয়ের পথে রওনা দেন। অথচ পরিবারে তখনও সাম্যবর্ণার মা কিছুই জানতেন না।
শোকের ছায়া নেমে আসে বসন্তপুরের গলিতে। কাউন্সিলর থেকে প্রতিবেশী, সকলেই বাকরুদ্ধ।
কিন্তু ঘটনাটি যেন সহজে মানতে পারছিল না কেউই। সাম্যবর্ণা ছিল সাঁতার জানা, ভারসাম্য রক্ষা করা এক তরুণী। বন্ধুরা বলতে থাকে,
“ও তো জল ভয় পেত না, তবু এমন হল কীভাবে?”
অন্যদিকে দিলীপবাবু যখন মুম্বই পৌঁছান, আশ্রম কর্তৃপক্ষ তাঁদের সঙ্গে যথেষ্ট নিরুত্তর আচরণ করে। কেউ কিছু বলতে চায় না, কেবল বলে,
“ও একা নেমেছিল জলে। অন্যরা তখন প্রার্থনায় ব্যস্ত।”
কিন্তু বাঁধের পাশে থাকা এক চায়ের দোকানি বলেন অন্য কথা।
“ওইদিন সকালেও এক যুবক এসেছিল আশ্রম থেকে, রোজ আসে না কিন্তু সেদিন এসেছিল। ওর সঙ্গেই সাম্যবর্ণা ধারে গিয়েছিল। তারপর… শুধু একটাই আওয়াজ শুনেছি—জলের ছ্যাঁক। আর কিছু না।”
দিলীপবাবুর সন্দেহ ঘনিয়ে ওঠে। পুলিশ তদন্ত শুরু করে। আশ্রমে বসানো সিসিটিভি’র ফুটেজে দেখা যায়—সাম্যবর্ণা একা বাঁধের দিকে যায়নি, তার সঙ্গে ছিল আশ্রমের শিক্ষক ভিক্রমজিৎ।
কিন্তু ক’দিন পরেই দেখা গেল সেই ভিক্রমজিৎ আশ্রম ছেড়ে নিখোঁজ।
এখন প্রশ্ন:
-
আদৌ কি এটি দুর্ঘটনা?
-
নাকি কিছু চাপা পড়া সম্পর্কের গোপন দিক?
কেসটির মোড় ঘোরাতে শুরু করে। সাম্যবর্ণার মোবাইল, ডায়েরি, গান লেখা খাতা—সবই খতিয়ে দেখা হয়। তার শেষ ডায়েরি এন্ট্রিতে ছিল এক লাইন:
“মন যে আজ বিশ্রাম চায়, এই আশ্রমে নাকি অশান্তি লুকিয়ে…”
তদন্ত চলছে।
আর বসন্তপুরের মানুষ প্রতিদিন অপেক্ষা করে—সত্য কখন উন্মোচিত হবে।
কারণ সবাই জানে, সাম্যবর্ণা তো এমনভাবে চলে যাওয়ার মেয়ে ছিল না।
শেষে থেকে যায় একটাই প্রশ্ন—
“ধ্যানের অন্তরালে কি লুকিয়ে ছিল মৃত্যুর ছায়া?”

