উদয়নারায়ণপুরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন গোপীনাথ জিউ মন্দির আজ ধ্বংসের মুখে। একসময় যে মন্দির ছিল স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন, সেখানে এখন নেই পলেস্তারার সামান্য চিহ্নও। ইটের গাঁথুনি বেরিয়ে এসেছে উন্মুক্তভাবে, কোথাও কোথাও আবার সেই গাঁথুনিও ভেঙে পড়েছে। সময়ের সাথে সাথে গাছের শিকড় সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরেছে সমগ্র কাঠামোকে, বর্ষা ও ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বেড়েছে। দূর থেকে বা হঠাৎ চোখে পড়লে জায়গাটি যেন ভৌতিক শূন্যতার আভাস দেয়।
এই মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কম নয়। প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বছর আগে উদয়নারায়ণপুরের ঐতিহ্যবাহী রানি রায় বাঘিনী ভবশংকরীর আমলে মন্দিরটি নির্মিত হয়। ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজাদের সময়কার এই স্থাপনা শুধু ধর্মীয় স্থানই নয়, স্থানীয় সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইতিহাসে উল্লেখ আছে, ভবশংকরী এক সময় পাঠান সেনাপতিকেও যুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন। সেনাপতি প্রাণ বাঁচাতে পিছু হটেন, আর তাঁর এই বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে মুঘল সম্রাট আকবর তাঁকে ‘রায় বাঘিনী’ উপাধি দেন।
তবে কয়েক শতাব্দী পরের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। বছরের পর বছর উপেক্ষিত থেকে এবং কোনো সংরক্ষণ না হওয়ায় মন্দিরটি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। স্থানীয় মানুষ এবং পর্যটকদের অভিযোগ, যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে একদিন এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যাবে।
কিছুটা আশার আলো জ্বালিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস আমলে নেওয়া উদ্যোগ। উদয়নারায়ণপুরের বিধায়ক সমীর পাঁজা ও কয়েকজন স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীর প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে ‘রানি রায় বাঘিনী ভবশংকরী স্মৃতি রক্ষা কমিটি’। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল রানির ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। এই উদ্যোগের ফলে একাধিক উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে, কিন্তু গোপীনাথ জিউ মন্দিরটি এখনো যেন উন্নয়নের তালিকায় উপেক্ষিত।
উদয়নারায়ণপুর পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত দপ্তরের কর্মাধ্যক্ষ ও স্মৃতি রক্ষা কমিটির সম্পাদক সুখেন চন্দ্র চন্দ বলেন, “মন্দিরটি অত্যন্ত প্রাচীন। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া বা হেরিটেজ ডিপার্টমেন্ট যদি এই মন্দিরের দিকে নজর দেয়, তাহলে সংরক্ষণ সম্ভব হবে।” তিনি জানান, ইতিমধ্যেই পর্যটন দপ্তরে মন্দির সংস্কারের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন পাঠানো হয়েছে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, তহবিল অনুমোদন পেলেই কিছু জরুরি সংস্কারের কাজ শুরু হবে। মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে মন্দিরের উপরে একটি শেড তৈরি করা হবে, যাতে বর্ষা ও রোদে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা হলেও কমানো যায়। তবে কবে সেই তহবিল আসবে এবং কাজ শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকরা।
তাঁদের মতে, এই মন্দির শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অমূল্য অংশ। তাই যত দ্রুত সম্ভব সংরক্ষণের কাজ শুরু হওয়া জরুরি, নইলে কয়েক বছরের মধ্যেই এই প্রাচীন নিদর্শন কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

