দিঘার সকালটা সেদিন ছিল অদ্ভুত অশান্ত। আকাশে কালো মেঘ, সমুদ্রের বুক ফুঁড়ে উঠে আসা বিশাল ঢেউ, আর বাতাসে লবণাক্ত গন্ধ। তবু পর্যটকদের উৎসাহে ভাটা পড়েনি। বহু মানুষ ভিড় জমিয়েছিলেন সৈকতে, কেউ ছবি তুলছেন, কেউবা পা ভিজিয়ে সমুদ্রের স্পর্শ নিচ্ছেন।
নারায়ণ সাউ, ওড়িশার বাসিন্দা, ও শঙ্কর হাজরা, হাওড়ার লিলুয়ার বাসিন্দা, সেই ভিড়েরই অংশ ছিলেন। দুজনেরই চোখে ছিল সমুদ্রের টান, উত্তাল ঢেউয়ের রোমাঞ্চ। সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা জলে নামার সিদ্ধান্ত নেন। ঢেউয়ের খেলা, জলের ছিটে, হাসি–সব মিলিয়ে মুহূর্তটা ছিল যেন স্বপ্নের মতো।
কিন্তু সেই স্বপ্ন ভাঙতে সময় লাগেনি। হঠাৎ এক বিরাট ঢেউ এসে দুজনকেই ভাসিয়ে নিয়ে গেল গভীরের দিকে। তীরে থাকা মানুষজনের চিৎকারে মুহূর্তেই ছুটে আসে নুলিয়ারা—দিঘার সাহসী লাইফগার্ডরা। এক ঝাঁপে তাঁরা পৌঁছে যান শঙ্করের কাছে এবং তাঁকে ধরে টেনে আনেন তীরে। কিন্তু নারায়ণ তখনও ঢেউয়ের কবলে, জলের তলায় হারিয়ে যাচ্ছেন।
এরইমধ্যে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় পুলিশ ও কোস্টগার্ড। উত্তাল সমুদ্রে প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে তাঁরা নারায়ণকে উদ্ধার করেন। দুজনকেই দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় দিঘা স্টেট জেনারেল হাসপাতালে। শঙ্কর তখনো জ্ঞান হারাননি, কিন্তু নারায়ণকে নিয়ে চিকিৎসকদের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়—সমুদ্রের বুক চিরে উঠে আসা সেই ঢেউ যেন চিরতরে কেড়ে নিল তাঁর জীবন।
শঙ্করের চিকিৎসা চলছে, চিকিৎসকরা বলছেন তিনি শঙ্কামুক্ত। তবে সমুদ্রের সেই মুহূর্ত তাঁর মনে চিরকালের জন্য দাগ কেটে যাবে।
স্থানীয়দের মতে, সেদিন সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা ছিল অস্বাভাবিক, আর বাতাসও ছিল প্রচণ্ড। কয়েকজন পর্যটক বিপদ বুঝে তীরে ফিরে এলেও, নারায়ণ ও শঙ্কর আর ফিরতে পারেননি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেদিনও সমুদ্রস্নান এড়িয়ে চলার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল, তবুও অনেকেই তা উপেক্ষা করেছিলেন।
দিঘা মোহনা থানার ওসি প্রবীর সাহা ঘটনার বিষয়ে গভীর শোক প্রকাশ করে জানান, “এটি অত্যন্ত দুঃখজনক একটি দুর্ঘটনা। কীভাবে এই ঘটনা ঘটল এবং সতর্কবার্তা সত্ত্বেও কেন পর্যটকরা সমুদ্রে নামলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
সেদিনের ঢেউ যেন শুধু একজন পর্যটককে কেড়ে নিল না, বরং সৈকতে উপস্থিত সকলের মনেও এক গভীর আতঙ্ক ও বেদনার স্মৃতি রেখে গেল। সমুদ্রের সৌন্দর্যের সঙ্গে তার রুক্ষ রূপও যে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, সেই নির্মম পাঠ দিয়ে গেল দিঘার সেই সকাল।
বিঃদ্রঃ – শুধুমাত্র কাহিনীর অবলম্বনে লেখা।
|| সমাপ্ত ||

