বন্ধ জানালার ভিতর
রিয়া ছিল দশম শ্রেণির ছাত্রী। স্বভাবতই চুপচাপ, কিন্তু চোখের মধ্যে ছিল এক অন্যরকম আলো—যে আলো সহজেই মানুষকে আপন করে নিতে পারে। মা-বাবা, স্কুল, পড়াশোনা আর ঘরের ছোট্ট খাঁচার মধ্যেই তার জগৎ।
দুই মাস আগে হঠাৎ করেই মারা যান রিয়ার প্রিয় মাসি। সেই থেকে তাদের বাড়িতে যাতায়াত শুরু হয় মাসির স্বামী, অমিতকাকুর। রিয়ার বাবা-মার সঙ্গে অমিতের সম্পর্ক ভালো ছিল। অমিত এলেই রিয়া যেন একটু স্বস্তি পেত। কারও সঙ্গে না বলা কথাগুলো ভাগ করে নিতে পারত তার সঙ্গে।
অমিত বয়সে অনেকটা বড় হলেও, ধীরে ধীরে রিয়া তাকে ‘বন্ধু’ ভাবতে শুরু করে। নিয়মিত কথা হত ফোনে, সামাজিক মাধ্যমেও। একদিন অমিত তাকে বলল, “তুই আমার মতো কাউকে deserve করিস, রিয়া। তোকে কেউ বোঝে না, আমি আছি।”
রিয়া বিশ্বাস করেছিল।
ভাঙা মোবাইল, ছেঁড়া বিশ্বাস
একদিন হঠাৎ রিয়া সাহস করে মা-বাবাকে জানায়, “আমি অমিতকাকুকে বিয়ে করতে চাই।”
পুরো পরিবারে যেন বিস্ফোরণ ঘটে। কাকু? বয়সে প্রায় দ্বিগুণ! তাও আবার আত্মীয়? রিয়ার মা কান্নায় ভেঙে পড়েন। বাবা রেগে গিয়ে রিয়ার ফোন ছিনিয়ে নেন। ফোন ভেঙে ফেলা হয়, রিয়ার সঙ্গে অমিতের যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়।
কোনো কৈফিয়ত, ব্যাখ্যা বা বোঝার সুযোগ ছাড়াই রিয়াকে একঘরে করে দেয় তার নিজের পরিবার।
সেই রাতে…
সেই রাতে মা-বাবা আত্মীয়ের বাড়ি যান। রিয়া একা ছিল তার দাদুর সঙ্গে। নিঃশব্দ, নির্জন রাত। দরজা বন্ধ করে ঘরে ঢোকে সে। বইয়ের তাকের পাশে শাড়ির ফাঁস তৈরি করে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে।
চোখ বেয়ে পড়ে অশ্রু। হয়ত কিছু ভাবছিল, হয়ত ভাবছিল সেই মুহূর্তে যদি কেউ এসে জড়িয়ে ধরে বলত, “আমি তোকে বুঝি”—তবে হয়ত সবটা পাল্টে যেত।
কিন্তু কেউ এল না।
পরদিন সকালে, তার ঝুলন্ত দেহ দেখে প্রথম চিৎকার করেন বৃদ্ধ দাদু। তারপর আসে পুলিশ, ময়নাতদন্ত, ফিসফাস, সন্দেহ, প্রশ্ন।
ফাঁস নয়, সমাজের অবিচার
রিয়াকে কে দোষী করবে? তাকে যে প্রলোভনে ফেলে একটা অসম সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, সেই অমিত? নাকি সে নিজে? নাকি সেই পরিবার, যারা প্রশ্ন না করে শাস্তি দিয়েছিল?
পাড়ার এক শিক্ষিকা বলেন, “এই সমাজে এখনও একটা মেয়ের কথা শোনার কেউ নেই। তার ভুল হতে পারে, কিন্তু বোঝানোর বদলে যদি তার হাতটা কেউ ধরে, হয়ত এমনটা হতো না।”
শেষ কথা
রিয়ার ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা ছিল:
“আমি ভুল করিনি, আমি শুধু ভালোবাসতে চেয়েছিলাম। কেউ বোঝেনি।”
এ গল্পটা রিয়ার মতো অনেক রিয়ার গল্প। যারা শোনাতে চায়, বোঝাতে চায়, ভালোবাসতে চায়। কিন্তু সমাজ তাদের শোনার আগে দাগ লাগিয়ে দেয়—কখনো চরিত্রে, কখনো গলায়।
সমাজের প্রশ্ন:
-
নাবালিকার সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক আত্মীয়ের সম্পর্ক কি শুধুই আবেগ? না কি প্রলোভন?
-
পরিবারের বোঝানোর ভাষা যদি কঠোর হয়, তবে সেটা কি সহানুভূতির চেয়ে বেশি ক্ষতিকারক নয়?
-
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে স্কুলে বা পরিবারে কোনো শিক্ষা বা সমর্থন কেন নেই?

