Homeদক্ষিণবঙ্গPurba Bardhaman: মিড-ডে মিলে মুড়ি

Purba Bardhaman: মিড-ডে মিলে মুড়ি

“গুড়মুড়ি কাণ্ড” শুধু একটি হাসির গল্প নয়, বরং শিক্ষা দেয়।

আউশগ্রামের শোকাডাঙা গ্রামে একদিন ভোরবেলা হইচই পড়ে গেল। গ্রামের পুকুরঘাট থেকে শুরু করে মাঠের ধারে চায়ের দোকান—সবার মুখে একটাই আলোচনা: “গুড়মুড়ি কাণ্ড!”

শোকাডাঙা আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৯৩ জন ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে, তার মধ্যে আবার ৩০ জন থাকে হস্টেলে। সরকারি নিয়মে প্রতি ছাত্রছাত্রীর জন্য মাসে ১৮০০ টাকা বরাদ্দ হয়। শুনতে তো দারুণ, মাসে ১৮০০ টাকা—তার মানে প্রতিদিনের খাবারে থাকবে ডিম, মাছ, মাংস, দুধ… এ রকম কল্পনাই করেছিল সবাই। কিন্তু হায়! বাস্তবে মিলত গুড়মুড়ি আর ভাতের সঙ্গে এক চামচ “চিরঞ্জীবি তরকারি”—মানে, রোজ একই সবজি!

একদিন সকালে গুড়মুড়ির সঙ্গে পিঁপড়ে এসে হাজির হল। ছাত্ররা বলল, “স্যার, আজ তো নতুন আইটেম এসেছে, গুড়মুড়ি আলা পিঁপড়ি ভাজা!” সবাই হেসে কুটোপাটি, কিন্তু ক্ষুধা মেটে না।

বাবা-মায়েরা শুনে ক্ষেপে আগুন। তারা বলল, “১৮০০ টাকা প্রতি মাথা! তার হিসাব কোথায় গেল?”

গ্রামের মাতব্বর ঘোষাল কাকু হিসেব কষতে বসে গেলেন।
—“৯৩ জন ছাত্রছাত্রী × ১৮০০ টাকা = আহা! একেবারে লক্ষ লক্ষ টাকার খেলা।”
সবাই হুঁশহুঁশ করে মাথা নাড়ল।

তারপর শুরু হল সত্যিকারের মিশন গুড়মুড়ি তদন্ত। গ্রামবাসীরা স্কুলে গিয়ে প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় বাবুকে কোণে বসিয়ে বললেন, “হিসেব দিন।”

সঞ্জয় বাবু চুপচাপ বসে আছেন। মুখে শুধু একটি সংলাপ:
—“আমি কোনও মন্তব্য করব না।”

গ্রামবাসীরা হাসতে হাসতে বলল, “মন্তব্য করতে হবে না, টাকা কোথায় গেছে সেটা বলুন!”

অভিভাবকরা ক্রুদ্ধ হয়ে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিলেন। পুরো স্কুল চত্বর তখন হয়ে গেল “গুড়মুড়ি আদালত।” ছাত্রছাত্রীরা জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখছে। একজন ফিসফিস করে বলল, “আজ ডিম না দিলেও কেলেঙ্কারি ডিম পাড়বই!”

এমন সময়ে পুলিশ এল। পুলিশ ভেবে পাচ্ছে না—এটা চুরি ডাকাতির মামলা, না কি খাবার মামা? শেষ পর্যন্ত প্রধান শিক্ষককে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হল।

হাসির মাঝেই শিক্ষা

গল্পটা শুনে মজা লাগলেও এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বড় শিক্ষা।

  1. হিসাব রাখা জরুরি: সরকারি টাকা জনগণের ট্যাক্সের টাকাই। সেই টাকার প্রতিটি পয়সার হিসাব রাখা উচিত। তা না হলে স্বচ্ছতার অভাব হয় এবং অবিশ্বাস বাড়ে।

  2. শিশুদের খাবার নিয়ে গাফিলতি নয়: যারা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, তাদের যদি পুষ্টিকর খাবার না মেলে, তবে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই মিড-ডে মিল বা আবাসিক খাবারে গুণগত মান বজায় রাখা জরুরি।

  3. গ্রামবাসীর জাগরণ শক্তি: শোকাডাঙার মানুষ দেখিয়ে দিলেন—যদি কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব পালন না করে, তবে সাধারণ মানুষও আওয়াজ তুলতে পারে। গণতন্ত্রের শক্তি এখানেই।

  4. অতিরিক্ত হাসিরও মূল্য আছে: এই ঘটনা নিয়ে অনেকে হাসাহাসি করলেও, সেই হাসির মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হল আসল সমস্যা। হাসি মাঝে মাঝে সত্যকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে।

শেষে এক বৃদ্ধা ঠাকুমা বললেন, “টাকা খরচ যদি গুড়মুড়িতে শেষ হয়, তবে তো সবার দাঁতও নড়ে যাবে!” সবাই হেসে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই ভ্রু কুঁচকাল—কারণ বিষয়টা সত্যিই গুরুতর।

উপসংহার

“গুড়মুড়ি কাণ্ড” শুধু একটি হাসির গল্প নয়, বরং শিক্ষা দেয়—সঠিক ব্যবহার ও স্বচ্ছতা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। ছাত্রছাত্রীদের মুখে হাসি ফোটাতে হলে শুধু গুড়মুড়ি নয়, চাই পুষ্টিকর খাবার আর জবাবদিহি। নয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সত্যিই বলবে, “আমাদের হিসেব মিলছে না, শুধু গুড়মুড়িই মিলছে।”

বিঃদ্রঃ – শুধুমাত্র কাহিনীর অবলম্বনে লেখা।

|| সমাপ্ত  ||

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন